পাঞ্জশিরে প্রবেশের দাবি তালেবানের, অস্বীকার মাসুদ সমর্থকদের

তালেবানরা দাবি করেছে, তাদের মুজাহিদ বাহিনী কোনো প্রতিরোধের মুখোমুখি না হয়েই শনিবার বিভিন্ন দিক থেকে পঞ্জশির প্রদেশে প্রবেশ করেছে। এক প্রতিবেদনে এই খবর দিয়েছে আফগানিস্তানের টোলো নিউজ।

তালেবানের সাংস্কৃতিক কমিশনের সদস্য আনামুল্লাহ সামাঙ্গানি বলেন, “কোন যুদ্ধ হয়নি, এবং আফগানিস্তানের ইসলামিক আমিরাতের মুজাহিদীনরা কোনো প্রতিরোধের মুখোমুখি না হয়েই বিভিন্ন দিক থেকে পাঞ্জশিরে প্রবেশ করেছে। ইসলামিক আমিরাতের বাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে পাঞ্জশিরে প্রবেশ করেছে”।

সামাঙ্গানি অবশ্য বলেছেন যে, আলোচনার জন্য দরজা এখনও খোলা আছে এবং শনিবার আহমদ মাসুদের একটি প্রতিনিধি দল কাবুলে তালেবান প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতও করেছে।

তবে পাঞ্জশিরের নেতা মাসুদের সমর্থকরা অবশ্য তালেবানদের পাঞ্জশিরে প্রবেশের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন যে, কেউ পাঞ্জশির প্রদেশে প্রবেশ করেনি।

পাঞ্জশিরের প্রতিরোধ ফ্রন্ট প্রতিনিধিদলের প্রধান মোহাম্মদ আলমাস জাহিদ বলেন, “পাঞ্জশিরে কোন লড়াই নেই এবং কেউ আমাদের প্রদেশে প্রবেশ করেনি”।

তালেবান এবং মাসুদের প্রতিনিধিদের মধ্যে গত ২৫ আগস্ট প্রথম দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় উভয় পক্ষ দ্বিতীয় দফা আলোচনার আগ পর্যন্ত একে অপরকে আক্রমণ না করতে সম্মত হয়েছিল।

সেসময় জাহিদ বলেছিলেন যে, দ্বিতীয় দফার আলোচনা আগামী দুই দিনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে, কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হলে পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।

জাহিদ বলেন, “আলোচনার ব্যর্থতা উভয় পক্ষের জন্যই ভারী পরিণতি বয়ে আনবে, কারণ যুদ্ধ বিদেশী হস্তক্ষেপের পথ সুগম করবে, আর বিদেশি হস্তক্ষেপ যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করবে”।

এদিকে, দুই আমেরিকান সিনেটর বলেছেন যে, পাঞ্জশিরকে একটি নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের কিছু নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।

কাবুলবাসীরা অবশ্য তালেবান ও মাসুদের সমর্থকদের মধ্যে শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন।

সংবাদ মাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুলশাহর-জাবাল সারাজ এলাকায় তালেবানরা পাঞ্জশির যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে তালেবানরা এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।

প্রসঙ্গত, আফগানিস্তানের প্রায় ৯৮ শতাংশ দখল করে ফেললেও পাঞ্জশিরে আটকে গেছে তালেবান। এমনকি গত সপ্তাহে পাঞ্জশিরে নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের পতাকাও উড়িয়েছে সালেহ-মাসুদ বাহিনী। 

১৯৮০-র দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আগ্রাসনকালে উপত্যকাটি বিখ্যাত হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানে প্রায় দশ বছর দখলদারি কায়েম রাখলেও সব রকম চেষ্টা-তদবির করেও পাঞ্জশির দখলে নিতে পারেনি সোভিয়েত সেনারা। তাদের সব কৌশলই ব্যর্থ করে দেন বর্তমান ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (এনআরএফ) নেতা আহমদ মাসুদের বাবা গেরিলা কমান্ডার আহমেদ শাহ মাসুদ। যিনি পুরো আফগানিস্তানেই বিখ্যাত। সে সময় হাজার হাজার সেনা পাঠিয়ে, হেলিকপ্টার ও ট্যাংকযোগে হামলা চালিয়েও তাকে পরাজিত করতে পারেনি সোভিয়েত ইউনিয়ন। 

এরপর আসে তালেবান। ১৯৯৬ সালে যখন গোটা আফগানিস্তান প্রায় তালেবানের দখলে, তখনও পাঞ্জশিরে নিজেদের ভূমির নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল আহমেদ শাহ মাসুদের বাহিনী। 

তালেবান ও আলকায়েদার বিরুদ্ধে বারবার গলা তোলায় ২০০১ সালে ওসামা বিন লাদেনের নির্দেশে আলকায়েদার আত্মঘাতি হামলায় খুন হতে হয় তাকে। কিন্তু তার পরেও পাঞ্জশির দখল করতে পারেনি তালেবান।

আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের একটি এই পাঞ্জশির। পাঞ্জশিরের অর্থ পাঁচ সিংহ। বলা হয়, দশম শতকে এই প্রদেশের এক পরিবারের পাঁচ ভাই একটি বাঁধ তৈরি করে বন্যার পানি ধরে রেখেছিল। গজনির সুলতাম মাহমুদের নির্দেশে সেই বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল বলে কথিত আছে। সেই পাঁচ ভাইয়ের সম্মানে এই প্রদেশের নাম রাখা হয় পাঞ্জশির। 

এই প্রদেশটি একটি প্রাকৃতিক একটি দুর্গ। চারদিকে হিন্দুকুশের পর্বত। মাঝে একটুকরো সমতল ভুমি। এখানে মোট এক লাখ ৭৩ হাজার মানুষের বাস। অধিকাংশ মানুষই জাতিতে তাজিক। দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে তাজিকদের।