শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘খুলে দেওয়া’র চেয়ে ‘খোলা রাখা’ বড় চ্যালেঞ্জ

আগামী ১২ সেপ্টেম্বর সারা বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। করোনাভাইরাসের মহামারীর কারণে বিশ্ব ২০২০ এবং ২০২১ সালটা মোটামুটি একটা টালমাটাল অবস্থার ভেতর দিয়ে পার করেছে। এই মহামারীর তীব্রতা এত প্রবল যে এরই মধ্যে বিশ্বে ৪৫ লক্ষাধিক মানুষ এ ভাইরাসের কারণে জীবন দিয়েছে। প্রায় ২২ কোটিরও বেশি মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর সব ধরনের আধুনিক এবং উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এ ভাইরাসের মোকাবিলা করা মানবসভ্যতার কঠিনতর একটি কাজ হিসেবে হাজির হয়েছে।

২০১৯ সালের শেষে চীনের উহানে প্রথম এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লেও ২০২০ সাল পুরোটাই ছিল বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের তীব্র প্রতাপ। নানান ধরনের লকডাউন ও শাটডাউন দিয়ে আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, সামাজিক (শারীরিক) দূরত্ব বজায় রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজ করা প্রভৃতির মাধ্যমে মানুষ সংক্রমণের তীব্রতা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু করোনা এতটুকু করুণা করেনি। কেড়ে নিয়েছে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ। বাংলাদেশও করোনাভাইরাসের প্রবল থাবা থেকে মুক্তি পায়নি। ২০২০ সালের মার্চের ৮ তারিখ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৬ হাজারের বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে জীবন দিয়েছে। করোনায় আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি ব্যক্তি। এমন একটা সময় বাংলাদেশ পার করেছে যখন গড়ে প্রায় প্রতিদিন ১৫ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছিল এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল গড়ে প্রতিদিন আড়াইশোর ওপরে। ফলে, বাংলাদেশেও লকডাউন-শাটডাউনের নামে বিভিন্ন ধরনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে মানুষের চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করার নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে করোনার প্রকোপ খানিকটা কমে এলে বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা, গণপরিবহন খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২১ সালের মার্চ থেকে নতুন করে আক্রান্তের এবং মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায়, যাকে বিশেষজ্ঞরা করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলেছেন, আবার সব ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যার ফলে সম্প্রতি করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায় এবং মৃত্যুর সংখ্যা কমতে শুরু করে। জুন-জুলাইয়ে যেখানে সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ, সেখানে এখন সংক্রমণের হার ১০ শতাংশের নিচে। পাশাপাশি চলছে করোনার টিকা প্রদান কর্মসূচি। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সরকার এখন ধীরে ধীরে সবকিছু খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কেননা, মানুষের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা বিধান করা, উন্নয়ন কর্মকা- এগিয়ে নেওয়া, অর্থনীতির চাকা সচল রাখার আর কোনো পথ খোলা নেই। অবশ্য এ ক্ষেত্রে টিকাদানের অগ্রগতি এবং করোনা সংক্রমণ শনাক্ত ও মৃত্যুর হার কমে আসাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতেই আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে। ২০২০ সালের মার্চের ১৮ তারিখের পর থেকেই বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বিগত ১৬-১৭ মাসের মধ্যে একদিনের জন্যও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হয়নি। কিছু অফিশিয়াল কাজ ছাড়া একদিনও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কেবল পরীক্ষা নেওয়ার জন্য অত্যন্ত সীমিত আকারে কিছু কিছু শিক্ষাকার্যক্রম চললেও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য একদিনও বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হয়নি। অনেকে বারবার খেদোক্তি করছিলেন এটা বলে যে, তৈরি পোশাক কারখানা খোলা রাখা সম্ভব হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কেন? সবকিছু খোলা, কিন্তু কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কেন?

আমার মনে হয়, করোনা সংক্রমণের হার একটা সহনীয় পর্যায়ে না-আসার আগ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না-খোলার সিদ্ধান্ত যথার্থ ছিল। কেননা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীর জন্য একটা বড় সম্মিলন-স্থান বা ‘গ্যাদারিং স্পেস’ যেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানা বেশ মুশকিলের বিষয়। ফলে, শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বা মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলার কোনো কারণ নেই। তাই, অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষা খাতের ক্ষতি খানিকটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও এটা স্বীকার্য যে, অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম সনাতন শিক্ষাপদ্ধতি বা সরাসরি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে শিক্ষাপদ্ধতির কোনোভাবেই বিকল্প হতে পারে না। তথাপি, করোনাভাইরাসের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার কোনো অভিজ্ঞতা আমাদের আগে ছিল না। ফলে, নতুন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে আমাদের নানান পদ্ধতি অবলম্বন করে শিক্ষাকার্যক্রম সচল রাখতে হয়েছে। পাঠদান ও পরীক্ষা পদ্ধতিতেও নানান পরিবর্তন আনা হয়েছে। যদিও এসব কিছু আমাদের প্রচলিত পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষাকার্যক্রমের বিকল্প নয়। ফলে, করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা অনস্বীকার্য যে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে শিক্ষা খাত। তাই, বিগত ১৬-১৭ মাসে শিক্ষা ক্ষেত্রে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, সেটা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে যে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে সিদ্ধান্তের যথাযথ বাস্তবায়নই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে রাখার ব্যবস্থা করা। কেননা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে কি না কিংবা কত দিন খোলা থাকবে সেটা নির্ভর করছে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছি তার ওপর। সরকার যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা সেটাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন আবার বন্ধ করে না-দেওয়া হয় বা আবার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত না-নিতে হয়, সেজন্য আমাদের সবার সক্রিয় সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণ আবশ্যক। আমি মনে করি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা যদি সম্মিলিতভাবে এবং সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থেই অত্যন্ত সুন্দরভাবে সচল থেকে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক পরামর্শ দেবেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালীন কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করবেন। যেকোনো মূল্যে সব শিক্ষার্থীর মাস্ক পরা নিশ্চিত করা, নিয়মিত হাত ধোয়া বা হাত স্যানিটাইজ করা এবং সামাজিক (শারীরিক) দূরত্ব বজায় রেখে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে এবং শিক্ষাঙ্গনের অবস্থান নিশ্চিত করার দায়িত্ব শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের। অভিভাবকদেরও এ ব্যাপারে সক্রিয় সহযোগিতা করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনা-নেওয়ার সময় স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যবস্থা করা; বাসায় যদি কোনো সদস্যের করোনার উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে ওই শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো থেকে বিরত রাখতে হবে। আর শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালীন সব সময় মাস্ক পরে এবং হাত স্যানিটাইজ করার মতো স্বাস্থ্যবিধি মানে সেজন্য যথাযথ পরামর্শ ও প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হবে অভিভাবকদের কাজ। আমরা বিশ্বাস করি, কোনো অভিভাবকই চাইবেন না যে, তাদের কোনো ছেলেমেয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হোক। কোনো শিক্ষকও চাইবেন না কোনো শিক্ষার্থী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হোক। তাই, আমাদের এ ‘না-চাওয়াকে’ কাজে বা বাস্তবে পরিণত করতে হলে অভিভাবক এবং শিক্ষকদেরই যথাযথভাবে সক্রিয় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। আর এভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘খুলে দেওয়াটা’কে আমরা ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে রাখা’য় পরিণত করতে পারব। আর সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়