মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় গ্রেপ্তারের পর পরীমনিকে দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। এতে করে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পাশাপাশি আইন অমান্য করা হয়েছে বলে কয়েকদিন আগে অভিমত দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে কিছু প্রশ্ন তুলে আদেশসহ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে বুধবার।
জামিন আবেদনের শুনানির দিন দেরিতে ধার্য নিয়ে পরীমনির করা এক আবেদনের ধারাবাহিকতায় ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কেএম জাহিদ সারওয়ারের বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
পুর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলছেন, ‘ই মামলায় মনে হচ্ছে তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পাশাপাশি আইন অমান্য করেছেন, যা ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে চলায় প্রতিবন্ধকতা। তা ছাড়া দুই দফা রিমান্ড আবেদন মঞ্জুরে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে এত সন্তুষ্ট হলেন, যা আমাদের বিচারিক ঐকমত্যকে বিদ্ধ করেছে।
আরও বলা হয়, নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার বিপরীতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করে। আইনের মীমাংসিত নীতি সংশ্লিষ্ট আইন অনুসরণ না করে কোনো নাগরিকের অধিকার বাধাগ্রস্ত করা যায় না। একইভাবে প্রতিটি নাগরিককে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়। দেশের উপযুক্ত কোনো আদালত থেকে সিদ্ধান্ত আসার আগে কারও ব্যক্তিগত জীবন ও স্বাধীনতা নিয়ে ‘ট্রলিংয়ের’ মতো অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দণ্ডিত করা উচিত নয়। সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ বলেছে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না কিংবা কারও সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না।
আদেশে বলা হয়, সুষ্ঠু ও স্বাধীন তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু নথিতে দেখা যায়, এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডের আবেদন করেন। কীসের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালত সন্তুষ্ট হয়ে রিমান্ড মঞ্জুর করে গত ১০ ও ১৯ আগস্ট আদেশ দিয়েছিলেন?
আদেশে বলা হয়, নথিতে দেখা যায়, প্রথমে অভিযুক্তকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। অবশ্যই এটি যথেষ্ট সময় কোনো তথ্য বা উপাদান থাকলে তা বের করার জন্য। কিন্তু পরবর্তী মেয়াদে আরও রিমান্ডের প্রয়োজনীয়তা যথেষ্ট ও পর্যাপ্ত উপাদান রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে না।
আদেশ পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবব্রত বিশ্বাস ও আতিকুল ইসলামের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হলো। কোন ঘটনা ও পারিপার্শ্বিকতায় তারা অভিযুক্তের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ড মঞ্জুরে উৎসাহিত হলেন- এর কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হলো। ব্যাখ্যা ও স্পষ্টিকরণ সন্তোষজনক না হলে আরও স্পষ্টিকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে আদালতে উপস্থিত হতে হবে।
আদালত বলছেন, অপরাধ এককভাবে পুলিশের জন্য সমস্যা নয়, সমাজের সমস্যা। পুলিশ বিভাগকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, মানবজীবন অত্যন্ত মূল্যবান। কোনো অভিযুক্তের জন্য রিমান্ড নেওয়ার আগে পুলিশ কর্মকর্তাকে আইনি ও মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রথমে চিন্তা করতে হবে। সমাজ পুলিশ বিভাগের ওপর সর্বোচ্চ আস্থা রাখে। আদালত উল্লেখ করেছেন, তদন্ত কর্মকর্তা কারণ ব্যাখ্যা করলে ন্যায়বিচার দৃশ্যমান হবে। তাই নিজের অবস্থান, কারণ ব্যাখ্যা ও স্পষ্টিকরণের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফাকে মামলার সিডি (নথি) নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হলো।
পরীমনিকে ৪ আগস্ট রাতে তার বনানীর বাসায় অভিযান চালিয়ে আটক করে র্যাব। পরে তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়। এরপর বারবার জামিন আবেদন নাকচ করে তিন দফায় সাতদিন রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
পরে মহানগর দায়রা জজ আদালতের এক আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন পরীমনি। শুনানি নিয়ে ২৬ আগস্ট হাইকোর্ট রুল দিয়ে ১ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন রাখেন। অন্যদিকে নিম্ন আদালত জামিন শুনানির দিন এগিয়ে আনেন। ৩১ আগস্ট শুনানি নিয়ে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ পরীমনির জামিন মঞ্জুর করেন। পরদিন ১ সেপ্টেম্বর কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান এ নায়িকা।