২০ বছর আগে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের টুইন টাওয়ারে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি বিমান বিমান আছড়ে। যা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ইচ্ছাকৃত সন্ত্রাসী হামলা ছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ওই সন্ত্রাসী হামলা ইতিহাসে 'নাইন-ইলেভেন হামলা' নামে ঠাঁই করে নিয়েছে’। ওই হামলায় ৬০ দেশের ২ হাজার ৭৪৯ জন মানুষ নিহত হন। এদের মধ্যে ১২ জন বাংলাদেশিও ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে ওই সন্ত্রাসী হামলার বিশ বছর পূর্ণ হয়েছে শনিবার। ওই হামলার জেরে গত বিশ বছর ধরে আফগানিস্তান যুদ্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অপরদিকে ঠিক ২০ বছরেই আফগানিস্তানে আবার ক্ষমতায় এসেছে তালেবান।
এ ২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত যুদ্ধে নিহত হয়েছে নয় লাখ মানুষ। খরচ হয়েছে আট ট্রিলিয়ন ডলার। নিহতদের বেশিরভাগই নিরীহ বেসামরিক মানুষ।
গত বিশ বছর ধরে বিশ্ব জুড়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এই যে লড়াই চলছে তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
৯/১১-র এই হামলা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলা। এ ঘটনার পর যখন দেশটি বিরাট এক ধাক্কা খেয়েছে, তখন অনেকেই বাকী বিশ্বকে দেখা শুরু করলেন একেবারে মোটা দাগের বিচারে- পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত, ভালো লোক আর খারাপ লোক।
নাইন ইলেভেনের হামলার ঠিক নয়দিন পরই প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ ঘোষণা করলেন, ‘প্রত্যেক দেশ, প্রত্যেক অঞ্চলকে এখন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনারা হয় আমাদের সঙ্গে আছেন, অথবা আপনারা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আছেন’।
তথাকথিত ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’ ঘোষণা করা হলো। এই ঘোষণার পর প্রথমে আফগানিস্তান এবং তারপর ইরাকে আক্রমণ চালানো হলো। মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর উত্থান ঘটলো। ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিস্তার ঘটলো। হাজার হাজার সৈনিক এবং তার চেয়ে আরও বহু গুণ বেসামরিক মানুষ নিহত হলো।
কিন্তু সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হয়নি- বরং ইউরোপের প্রায় প্রত্যেকটি বড় দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে।
তবে কিছু সাফল্যও আছে। এখনো পর্যন্ত নাইন ইলেভেনের সঙ্গে তুলনীয় ভয়ংকর কোন হামলা হয়নি। আফগানিস্তানে আল-কায়েদার ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে। তাদের নেতাকে পাকিস্তানে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয়েছে। আইসিস সিরিয়া এবং ইরাকের একটা বিরাট অঞ্চলে স্বঘোষিত খেলাফতের মাধ্যমে যে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, তা ভেঙে দেয়া হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় নৈতিক পরাজয় ঘটেছে এই যুদ্ধ করতে গিয়ে।
বিবিসির ফ্রাঙ্ক গার্ডনার বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ একটা কথা আমাকে বার বার বলেছেন: আমরা হয়তো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি পছন্দ করি না, কিন্তু তাদের দেশে আইনের শাসনকে আমরা সবসময় শ্রদ্ধা করি। তবে গুয়ানতানামো বে’র আগে পর্যন্ত’।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সন্দেহভাজনদের, বা কোন কোন ক্ষেত্রে নিরপরাধ লোকজনকে ধরে আনা, যাদেরকে আসলে পুরস্কারের লোভে একধরণের বিক্রি করা হয়েছে- এরপর তাদেরকে ন্যাপি আর গগলস পরিয়ে অর্ধেক পৃথিবী ঘুরিয়ে কিউবার গুয়ানতানামো বে’র এক মার্কিন নৌ ঘাঁটিতে বন্দী করে রাখা- এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের সুনামের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে।
বিনা বিচারে লোকজনকে বন্দী করে রাখার মতো ঘটনা ঘটতো স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোতে। আরবরা আশা করেনি যে আমেরিকাতেও এটা ঘটতে পারে।
এরপর যা ঘটেছিল, তা ছিল আরও মারাত্মক। সিআইএ এসব জায়গায় ওয়াটারবোর্ডিং (বন্দীদের মাথায় পানি ঢেলে তারা পানিতে ডুবে যাচ্ছে এমন এক অনুভূতি তৈরি করা) এবং আরও নানা রকম কৌশলে বন্দীদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছিল জিজ্ঞাসাবাদের সময়। ওবামা প্রশাসন এসে এসব বন্ধ করেছিল, কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।
৩১ আগস্ট আফগানিস্তান থেকে চুড়ান্তভাবে সব সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার অনেক আগে থেকেই আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক পরাজয় শুরু হয়ে গিয়েছিল।
গত বিশ বছর ধরে বিশ্ব জুড়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই চলছে তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, নতুবা নৈতিক অবস্থান হারানো।