পেরুর দক্ষিণ উপকূলের মোলেন্দো শহরের কাছে ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বরে এক ধনী বণিক বাবার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন অ্যাবিমায়েল গুজম্যান। গুজম্যানের মা মারা যাওয়ার পর সেই ধনী বাবাই তাকে বড় করেছিলেন।
ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি গরীব মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লব করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
ধনী পরিবারের সন্তান হওয়ায় প্রথম জীবনে এই বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা বেশ স্বচ্ছল জীবন যাপন করেছেন। তিনি একটি প্রাইভেট ক্যাথলিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এবং পরে আরেকুইপা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, যেখানে তার একটি গবেষণাপত্র ছিল জার্মান দার্শনিক ইম্মানুয়েল কান্টের ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি মার্ক্সবাদেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
১৯৬২ সালের মধ্যে তিনি কেন্দ্রীয় শহর আয়াকুচোর হুয়ামাঙ্গা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সান ক্রিস্টাবল-এ দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে স্থান অর্জন করেছিলেন।
১৯৬৫ সালে চীন ভ্রমণের সময় গুজম্যান কমিউনিস্ট নেতা মাও সেতুংকে দেখে বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং পেরুতে ফিরে আসার পর তিনি আইয়াকুচো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমমনা শিক্ষাবিদদের তার সঙ্গে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিলেন।
১৯৬৯ সালে তিনি এবং অন্য ১১ জন মিলে শাইনিং পাথ, স্পেনিশ ভাষায় সেন্ডেরো লুমিনোসো নামের একটি বিপ্লবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পেরুর কমিউনিস্ট জোসে কার্লোস মারিয়েতেগুইয়ের স্মরণে এই নামটি বেছে নেওয়া হয়েছিল, যিনি বলেছিলেন, 'মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হল ভবিষ্যতের উজ্জ্বল পথ'।
মাওবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে এই গেরিলা গোষ্ঠী পেরুর 'বুর্জোয়া গণতন্ত্র'কে উৎখাত করতে এবং কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য 'জনযুদ্ধ' পরিচালনার চেষ্টা করেছিল। পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির একটি শাখা, এই গ্রুপটি প্রথমেই সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়নি।
তবে ১২ বছর ধরে পেরুতে শাসন করা সেনাবাহিনী ১৯৮০ সালে যখন গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয় তখন শাইনিং পাথ শুধু নির্বাচনই বর্জন করেনি বরং আয়াকুচোতে ব্যালট বাক্স জ্বালিয়ে সক্রিয়ভাবে নির্বাচন ব্যাহত করেছে। তাদের লক্ষ্য ছিল কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, তাই তারা গণতান্ত্রিক নির্বাচনে আগ্রহী ছিল না।
বিদ্রোহী গ্রুপটি তাদের দখল করা গ্রামীণ এলাকায় তাদের কঠোর শাসন চাপিয়ে দেয়, এবং সরকারের পাশে থাকার সন্দেহে গ্রামবাসীদের হত্যা করে। শো ট্রায়াল এবং পাবলিক এক্সিকিউশনের মাধ্যমে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় তারা।
পরের বছরগুলোতে এর সদস্যরা যে হত্যাকাণ্ড ও গাড়ি বোমা হামলা চালিয়েছিল তা সরকারকে প্রায় হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দিয়েছিল।
সরকার পার্বত্য অঞ্চলে জরুরী অবস্থা জারি করে এবং পাল্টা লড়াই করার জন্য রন্ডা নামে পরিচিত স্থানীয় মিলিশিয়াকে সশস্ত্র করে তোলে।
বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অত্যাচার কিছু মানুষকে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, শাইনিং পাথের পক্ষে নিয়ে যায়।
কিন্তু শাইনিং পাথ এর নিয়মের নিষ্ঠুর প্রয়োগ এবং শো ট্রায়াল ও মৃত্যুদণ্ডের কারণে তারা সাধারণ মানুষের সমর্থন হারায়।
১৯৮৩ সালে সান্টিয়াগো ডি লুকানামারকা এলাকায় এবং আশেপাশে ৬৯ জন স্থানীয় লোককে কুড়াল, গুলি এবং বন্দুক দিয়ে হত্যা করার পর তাদের প্রতি মানুষের সমর্থন আরও কমে যায়।
কিন্তু নৃশংসতা শুধু গ্রামাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৯২ সালে লিমার মিরাফ্লোরেস জেলায় শাইনিং পাথ দুটি ট্রাক বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, যার ফলে ২৫ জন নিহত এবং আরও ১৫৫ জন আহত হয়েছিল।
১৯৯২ সালের সালের সেপ্টেম্বরে পেরুর গোয়েন্দারা অবশেষে লিমাতে একটি নাচের স্টুডিওর উপর থেকে গুজম্যানকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকেই শাইনিং পাথের বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে আসে।
কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ করছিল যে বিদ্রোহীরা রাজধানীর কোনো অ্যাপার্টমেন্টে লুকিয়ে আছে এবং ব্যালারিনা মারিটজা গ্যারিডো লেকার মালিকানাধীন একটি আপার্টমেন্ট সন্দেহজনক হয়ে উঠেছিল।
যদিও তিনি একা থাকার দাবি করেছিলেন, কিন্তু অ্যাপার্টমেন্টটি থেকে যে পরিমাণ আবর্জনা তৈরি হচ্ছিল তা কেবল একজনের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব ছিল না। ফলে গোয়েন্দাদের সন্দেহ তৈরি হয়।
এজেন্টরা যখন সেখানে অনুসন্ধান চালায় তখন ত্বকের রোগের চিকিৎসার ওষুধ খুঁজে পায়। যা থেকে তাদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। কারণ গুজম্যান একটি ত্বকের রোগে ভুগছিলেন বলে জানা গিয়েছিল।
অফিসাররা গুজম্যানকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী এলিনা ইপারাগুইয়িরে এবং অন্যান্য বিপ্লবীদের সঙ্গে গ্রেপ্তার করেছিলেন। গ্রেপ্তারের সময় তিনি টেলিভিশনে বক্সিং দেখছিলেন বলে জানা যায়।
মাত্র কয়েক মাস আগে পেরুর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আলবার্তো ফুজিমোরি আরোপিত নতুন কঠোর বিচারিক ব্যবস্থার অধীনে তিন দিনের বিচারের পর গুজম্যানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারকরা তাদের পরিচয় গোপন রাখতে হুড পরা অবস্থায় আদালতে এসেছিলেন।
তাকে সমুদ্রের মাঝখানে সান লরেঞ্জো নামের একটি দ্বীপে অবস্থিত নৌ ঘাঁটিতে বন্দী করে রাখা হয়েছিল।
১৯৯৩ সালের অক্টোবরে এই মাওবাদী নেতা টেলিভিশনে উপস্থিত হন এবং প্রকাশ্যে তার অনুগামীদের 'শান্তির জন্য লড়াই' করার আহ্বান জানান। তার ওই আহবানের পর, সরকারী ক্ষমা কর্মসূচির আওতায় শাইনিং পাথের প্রায় ৬ হাজার সদস্য আত্মসমর্পণ করে।
গুজম্যানের গ্রেপ্তারের পর থেকে শাইনিং পাথের বেশ কয়েকজন সিনিয়র সদস্য ধরা পড়ে এবং এই গেরিলা গ্রুপটিকে মূলত ভেঙে ফেলা হয়। শুধুমাত্র ছোট্ট একটি অংশ আন্দিজ অঞ্চলে সক্রিয় আছে, যারা যেখানে মূলত মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত।
২০০৪ সালে গুজম্যানকে আরেকটি দীর্ঘ বিচারের মুখোমুখি করা হয়, যখন প্রেসিডেন্ট ফুজিমোরির স্বৈরাচারী ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় সাংবাদিকরা ওই বিচার কার্যক্রম অনুসরণ করতে পারেনি।
২০০৬ সালের অক্টোবরে গুরুতর সন্ত্রাস ও হত্যার দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং পুনরায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গুজমান তার জীবনের অবশিষ্ট বছরগুলি লিমার পশ্চিমে এল ক্যালাওয়ের একটি নৌ ঘাঁটির নির্জন কারাগারে কাটিয়েছিলেন। ২০১০ সালে তাকে তার সহকর্মী ও শাইনিং পাথ গেরিলা এলিনা ইপারাগুইয়িরের সঙ্গে কারাগারে বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
দর্শনশস্ত্রের সাবেক এই অধ্যাপক ১৯৯২ সাল থেকে সন্ত্রাসবাদ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করে আসছিলেন। কারবন্দী অবস্থায়ই পেরুর শাইনিং পাথ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এই নেতা ও প্রতিষ্ঠাতা ৮৬ বছর বয়সে গতকাল মারা গেছেন। গত জুলাই মাসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
তার প্রতিষ্ঠিত মাওবাদী বিপ্লবী সংগঠন শাইনিং পাথ এবং পেরুর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘর্ষে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে।