সমাবেশের আগেই হল ভাড়া মওকুফ, প্রণোদনার আশ্বাস

দেশের সকল সরকারি মিলনায়তন আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সাংস্কৃতিক সংগঠনকে বিনা ভাড়ায় বরাদ্দ দেয়ার পাশাপাশি প্রতিটা সাংস্কৃতিক সংগঠনকে করোনাকালীন বিশেষ অনুদান দেয়ার দাবি জানিয়েছে সংস্কৃতিকর্মীরা। শুক্রবার বিকেলে ঢাকার জাতীয় নাট্যশালার সামনে এক সমাবেশে এ দাবি জানানো হয়।

এদিকে সমাবেশের আগেই বৃহস্পতিবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে শিল্পকলা একাডেমি জানিয়েছে, করোনাকালীন সংকটের কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে একাডেমির সকল মিলনায়তন ও মহড়া কক্ষ বিনা ভাড়ায় বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন ভাড়া মওকুফের বিষয়টিও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

বিনা ভাড়ায় মিলনায়তন বরাদ্দ নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালায় ঢাকা থিয়েটার ও আরণ্যক নাটক মঞ্চায়ন করেছে। মূল মিলনায়তনে ঢাকা থিয়েটার মঞ্চস্থ করেছে ‘একটি লৌকিক ও অলৌকিক স্টিমার’। পরীক্ষণ থিয়েটার মিলনায়তনে আরণ্যক মঞ্চস্থ করেছে ‘কহে ফেসবুক’ নাটকটি।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ সমাবেশে বলেন, ‘একাডেমির সকল মিলনায়তন বিনা ভাড়ায় বরাদ্দ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, এটি একাডেমির মহাপরিচালক আমাকে জানিয়েছেন। কিন্তু কয়েকটি সংগঠন থেকে আমাকে জানানো হয়েছে, একাডেমি মহড়া কক্ষের ভাড়া নিয়েছে এবং মিলনায়তনের ভাড়াও চেয়েছে। এতে করে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি একাডেমির মহাপরিচালককে জানানোর পর তিনি বলেছেন, এটি খতিয়ে দেখা হবে। যেসব সংগঠনের মহড়া কক্ষের ভাড়া নেয়া হয়েছে, সেটি ফেরত দেয়া হবে। এছাড়া জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনের জন্য ভাড়া দিতে হচ্ছে। জেলা প্রশাসকেরা বলছেন, প্রজ্ঞাপন না জারি হলে তারা বিনা ভাড়ায় বরাদ্দ দেবেন না। আমরা প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানিয়েছি।’

প্রণোদনার দাবিতে সংস্কৃতিকর্মীদের সমাবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে শুক্রবার বিকেলে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালীন সময় আমরা সংস্কৃতিকর্মীদের অনুদান দেয়ার প্রক্রিয়া চলমান রেখেছি। অনেক সংগঠনকে মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান দেয়া হয়েছে এবং সংস্কৃতিকর্মীদেরও প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এখন এই সমাবেশ কেন করা হচ্ছে? বিষয়টি আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। সমাবেশ না করে আমাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করতে পারতেন। আলোচনায় সমাধান না হলে সমাবেশ করতেন। আমি শুধু বলব, সংস্কৃতিকর্মীদের পাশে মন্ত্রণালয় সব সময় আছে। সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, আমরা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করব।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফসহ জাতীয় ভিত্তিক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা। বিকেল ৫টায় সমাবেশের শুরুতে করোনাকালে প্রয়াত সংস্কৃতিজনদের জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে সমাবেশের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বক্তব্য দেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ।

সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি বলেন, ‘করোনাকালে দেশের সংস্কৃতিকর্মীরা আর্থিক সংকটে পড়েছে। আমরা বেশ কিছু দাবি সরকারের কাছে জানাতে এই সমাবেশ করছি। আমরা চাই, সরকার আমাদের এই দাবিগুলো মেনে নেবে। সারা দেশের সকল সরকারি মিলনায়তন সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য বিনা ভাড়ায় বরাদ্দ দিতে হবে। পাশাপাশি যেসব সংগঠন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে, প্রতিটা সংগঠনকে ৫ হাজার টাকা করে প্রণোদনা দিতে হবে।’

গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘করোনাকালে সারা দেশের সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জেলা শহরের অনেক সংস্কৃতিকর্মীরা সেটি পেলেও ঢাকা মহানগরের সংস্কৃতিকর্মীরা সেই প্রণোদনা এখনো পাননি। সেটি বিলম্ব হওয়ার কারণও খতিয়ে দেখা হোক। এছাড়া অসচ্ছল সংস্কৃতিকর্মীদের সম্মানী দেওয়া হয় ১২০০ টাকা। আমরা দাবি জানিয়েছি এটিকে অন্তত ১০ হাজার টাকা করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলার একাডেমিতে দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়া হোক এবং তাদের সম্মানজনক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হোক।’

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘প্রণোদনার কথা উঠলে আমার তৃণমূল পর্যায়ের শিল্পীদের কথা মনে হয়, লোকশিল্পীদের কথা মনে হয়। তারা শিল্পকে আঁকড়ে ধরেই জীবিকা নির্বাহ করে। করোনায় আর্থিক সংকটে পড়েছে লোকশিল্পীরা। তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের সরকারি প্রণোদনা দেয়ার দাবি জানাই। অনেক সংগঠন আছে, যাদের কোনো কর্মযজ্ঞ নেই। কিন্তু সরকারি অনুদান পায়। আবার যোগ্য সংগঠন অনুদান পায় না। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুদান প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা দরকার।’

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং শিল্পকলা একাডেমিতে এত সচিব, উপসচিবসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা রয়েছেন। কিন্তু তারা সংস্কৃতিকর্মীদের কী কাজে আসছে? প্রশ্ন তুলে বক্তব্য দেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ।

দেশের অগ্রজ এই নাট্যব্যক্তিত্ব বলেন, ‘দেশের কত কবি, শিল্পী না খেয়ে আছেন। একটা মন্ত্রণালয়, এত সচিব, উপসচিব  তারা কী এর খবর রাখেন? দেশের প্রকাশনা শিল্প ধ্বংসের মুখে রয়েছে। তিনটি বইমেলা ঠিকমতো হয়নি। শিল্পকলা একাডেমিকে সত্যিকারের একটা একাডেমি হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। মন্ত্রণালয় থেকে মাঝে মাঝে ৫ হাজার, ১০ হাজার টাকা বা ৬০ হাজার টাকা অনুদান দিয়ে ভাবে আমাদের দয়া করছে। আমরা দয়া চাই না। অনুদান পাওয়া আমাদের অধিকার। আপনারা আমাদের টাকা, আমাদেরকে দিচ্ছেন। তাহলে এই দয়া করার মনোভাব কেন? গার্মেন্টস শিল্প প্রণোদনা পায়। কিন্তু সংস্কৃতিকর্মীরা পায় না। আমি মনে করি, এই বিষয়গুলো ফয়সালা হওয়া দরকার। আমরা নাট্যকর্মীদের নিয়ে আন্দোলন করব। আমাদেরকে আমাদের অধিকার আদায় করে নিতে হবে। সারাদেশে একই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। মফস্বল শহরগুলোতে এখন নাট্যচর্চা নেই। টাউট-বাটপাররা সেখানে রাজত্ব করছে। ঢাকার শিল্পকলায় যেমন প্রণোদনা, সারা দেশে একই প্রণোদনা দিতে হবে।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘সংস্কৃতিকর্মীরা মৌলবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আজকে নিজেদের অধিকারের জন্য দাঁড়িয়েছে। সারা দেশের মিলনায়তনগুলো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপযোগী করা এবং সেখানে সংস্কৃতিকর্মীরা যেন নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে পারে তার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’

সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতি লিয়াকত আলী লাকী। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় শিল্পকলার অডিটোরিয়ামের মতো কম ভাড়ায় হল পাওয়া খুব কঠিন। আগেও একবার দাবি উঠেছিল, যে জাতীয় নাট্যশালা ৫ হাজার টাকা ভাড়া নেয়- সেটা বেশি। তখন ঢাকার অন্যান্য মিলনায়তন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে অন্য হলের ভাড়া আরও কয়েক গুণ বেশি। শিল্পকলায় অনেক সংকট আছে। তবে আমাদেরকে একযোগে কাজ করতে হবে।’

সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন গ্রুপ থিয়েটারের ফেডারেশনের কামাল বায়েজীদ, সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের বিশ্বজিৎ রায়, পথনাটক পরিষদের আহাম্মেদ গিয়াস, চারুশিল্পী পরিষদের কামাল পাশা চৌধুরী, আবৃত্তিশিল্পী রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।