সবাইকে নিয়ে সরকার গঠনে তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় ইমরান খান

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, আফগানিস্তানের সরকারে যাতে তাজিক, উজবেক এবং হাজারাসহ সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব থাকে সে লক্ষ্যে তিনি তালেবানের সাথে আলোচনা শুরু করেছেন। খবর: বিবিসি।

যদিও অভিযোগ উঠেছে যে, পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকার কারণেই সবার অংশগ্রহণের একটি সরকার গঠনের প্রস্তাব দেওয়ায় তালেবানের সহ প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা বারাদারকে কোনঠাসা করে রাখা হয়েছে। মোল্লা বারাদারই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের শান্তি আলোচনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

টুইটারে এক পোস্টে ইমরান খান জানিয়েছেন, তাজিকিস্তানে সম্প্রতি সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের এক শীর্ষ সম্মেলনে আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকের পর তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন।

ইমরান খান বলেন, আফগানিস্তানে ৪০ বছর ধরে যুদ্ধ চলার পর নতুন সরকারে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব থাকলে তবেই সে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।

তালেবানের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বেশিরভাগ সদস্যই পশতুন জাতিগোষ্ঠীর এবং মন্ত্রীসভায় একজনও নারী নেই।

বিবিসির সংবাদদাতা লিস ডুসেট সম্প্রতি এক নিবন্ধে লিখেছেন, বেশ কিছুদিন ধরেই তালেবান নেতারা এসব কথা বলে আসছিলেন, ‘আমরা এমন একটি সরকার গঠন করার চেষ্টা করছি যাতে আফগানিস্তানের সকল জনগণের প্রতিনিধিত্ব থাকে’।

‘আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই,’ বলেছিলেন তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ্ মুজাহিদ। ঝড়ের গতিতে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর গত ১৫ই অগাস্ট কাবুলে তালেবানের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ‘আমরা দেশের ভেতরে বা বাইরে কোন শত্রু চাই না’।

তিনি লিখেছেন, তালেবান সবাইকে নিয়ে সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটা একেবারেই হয়নি।

তালেবানের নেতৃত্বে পুরনো কাঠামো, এর নানা ধরনের কমিশন, ডেপুটি এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আমির হেবাতুল্লাহ্ আখুনজাদা- এদের সবাইকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে মন্ত্রিসভার কাঠামোর মধ্যে, যেমনটি অন্য দেশের সরকারের রাজনৈতিক কাঠামোতেও দেখা যায়।

পুরনো তালেবান সরকারের নৈতিকতা সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়টি পুনর্বহাল করা হয়েছে। নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাতিল করা হয়েছে। সরকারের সদস্যরা বেশিরভাগই পশতু জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। মন্ত্রিসভায় রয়েছেন একজন তাজিক এবং একজন হাজারা- তারা দুজনেই তালেবানের সদস্য। একজন নারীকেও মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া হয়নি। এমনকি উপমন্ত্রীর মর্যাদায়ও কোন নারী নেই।

তালেবানের এই নতুন সরকার গঠিত হয়েছে পুরনো তালেবান নেতা এবং নতুন প্রজন্মের মুল্লাহ্ ও সামরিক অধিনায়কদের নিয়ে। ১৯৯০-র দশকে তালেবানের যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা ফিরে এসেছেন। তাদের দাড়ির রঙ এখন সাদা, দাড়ির দৈর্ঘ্যও বেড়েছে।

মার্কিন বাহিনীর বিদায়ে কাবুল দখল যত সহজ হয়েছিল, সরকার গঠন তত সহজ হচ্ছে না তালেবানদের জন্য। সরকার গঠন করতে গিয়ে উল্টো রক্তক্ষয়ী বিবাদে জড়িয়েছে তারা।

এমনকি এই অন্তর্কোন্দলে তালেবানের সবচেয়ে আলোচিত মুখ মোল্লা আবদুল গনি বারাদার মরতেই বসেছিলেন।

ওই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন কয়েকজনের বরাতে ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করেছে।

এতে বলা হয়, বিশ্ববাসীর কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করতে তালেবানের বাইরে আছেন এমন নেতা ও সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিসহ ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ একটি মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য সেপ্টেম্বরের শুরুতে ওই আলোচনায় জোর দিচ্ছিলেন বারাদার।

একপর্যায়ে হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা খলিলুর রহমান হাক্কানি তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান এবং তালেবান নেতা বারাদারকে ঘুষি মারতে শুরু করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তাদের দেহরক্ষীরাও এই সংঘর্ষে যোগ দিয়ে পরস্পরের প্রতি গুলি ছুড়তে শুরু করলে কয়েকজন মারা যান এবং বেশ কয়েকজন আহত হন।’

‘বারাদার আহত না হলেও রাজধানী ছাড়েন। তালেবানের ঘাঁটি কান্দাহারে সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার সঙ্গে দেখা করতে যান’ দাবি করা হয় প্রতিবেদনে।

হাক্কানি পরিবারের সদস্যরা চারটি মন্ত্রণালয় পেয়েছেন। এফবিআইয়ের তালিকার শীর্ষ সন্ত্রাসী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি হয়েছেন তালেবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

গত ২০১৬ সালের দিকে হাক্কানি নেটওয়ার্ক তালেবানের সঙ্গে একীভূত হয়। হাক্কানির সঙ্গে পাকিস্তানের সুসম্পর্ক আছে বলে বলা হয়েছে। তবে তাদের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক স্বস্তিকর নয়।

বারাদার সরকারপ্রধান হবেন বলে ভাবা হলেও ‘পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকায়’ তাকে উপ-প্রধানমন্ত্রী করা হয় গুঞ্জন রয়েছে। তার বদলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বল্প পরিচিত মোল্লা মোহাম্মদ হাসানকে বেছে নেওয়া হয়।

শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে মুক্তি পাওয়ার আগে আট বছর পাকিস্তানে কারাবন্দি ছিলেন মোল্লা বারাদার।