চীনকে মোকাবেলা করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন মিলে অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করে দেওয়ার জন্য অকাস নামের যে নিরাপত্তা চুক্তি করেছে, তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইম্মানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের দেশে ফিরিয়ে এনেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতদের দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনা ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের পর আর ঘটেনি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ফ্রান্স কি বাড়াবাড়ি রকমের নাটকীয় প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেছে? আরেকটা প্রশ্ন, এর বেশি ফ্রান্স আর কী করতে পারে?
আমেরিকান বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ইম্মানুয়েল ম্যাক্রোঁ ঝুঁকি নিতে ভয় পান না ঠিকই, কিন্ত এবার তিনি খুব বেশি বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছেন।
তিনি তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ ইভ লু দ্রিয়াঁকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘পিঠে ছুরি মারা’, ‘মিথ্যা’, ‘দ্বিচারিতা’, ‘অপমান’, ‘নির্মমতা’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতে দিয়েছেন, যা সচরাচর কূটনীতিতে শোনা যায়না, আর যখন ব্যাপারটা দুই মিত্র দেশের মধ্যে, তখন তো একেবারেই নয়।
অনেকে আবার বলছেন, এই যে দ্বিধাহীন স্পষ্টবাদিতা, এটা প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর একটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, এবং এ জন্যই তিনি মাত্র ৩৯ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।
বিবিসির বিশ্লেষক বারবারা প্লেট-আশার লিখেছেন, এটা এক নজিরবিহীন ঘটনা। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার প্রাচীনতম বন্ধু ফ্রান্স এবং হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারাও একে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন’।
আসলেই তাই, কারণ যুক্তরাষ্ট্র তার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিল ব্রিটেনের বিরুদ্ধে, এবং সেসময় তার মিত্র ছিল ফ্রান্স।
ফ্রান্সের এত ক্ষিপ্ত হবার কারণ প্রধানত তিনটি- একটা কারণ, অকাস চুক্তি করার আগে অস্ট্রেলিয়া ফ্রান্সের সাথে করা ডিজেলচালিত ১২টি সাবমেরিন নির্মাণের চুক্তিটি বাতিল করে, যা ছিল ৪ হাজার কোটি ডলারের এক বিশাল চুক্তি, এবং এটি বাতিল হওয়ায় ফ্রান্সের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।
তা ছাড়া ফ্রান্সের ভাষ্য অনুযায়ী তাদের কিচ্ছু না জানিয়ে অত্যন্ত গোপনে করা এই চুক্তি করে ফ্রান্সকে অপমান করা হয়েছে, এবং নেটো মিত্রদের মধ্যকার বিশ্বাস ও আস্থা এতে ভেঙে গেছে।
তা ছাড়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ফ্রান্সের নিজস্ব স্বার্থ আছে। সেখানে নিউ ক্যালেডোনিয়ার মত দ্বীপগুলোতে বহু ফরাসী নাগরিক বাস করেন, এবং কয়েক হাজার ফরাসী সৈন্যও মোতায়েন আছে। তাই অস্ট্রেলিয়ার সাথে সাবমেরিন চুক্তি বাতিল হওয়ায় ফ্রান্স ওই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বৃদ্ধির একটি সুযোগ হারালো।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষক রজার কোহেন বলেন, ‘ম্যাক্রোঁ মনে করেন, এই সাবমেরিন-কাণ্ডে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে নেটো জোট এখন পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাবে পঙ্গু এবং অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যে জিনিসটা আঠার মত সবাইকে একসাথে রেখেছিল, তা অদৃশ্য হয়ে গেছে। ফরাসীরা মনে করছে সাবমেরিন চুক্তি যেভাবে করা হয়েছে তাতে কোন স্বচ্ছতা ছিল না এবং এটা না থাকলে জোট কথাটার কোন অর্থ নেই’।
ইম্মানুয়েল ম্যাক্রোঁ বেশ কিছুকাল ধরেই নেটোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইইউর একটি নিজস্ব সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার কথা বলছিলেন।
এখন কি তাহলে তিনি সেই প্রয়াস আরো জোরদার করতে ইইউকে চাপ দেবেন?
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এখন নিউইয়র্কে আছেন জাতিসংঘের সভায় যোগ দিচ্ছে। সেখানেই এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর তারা ফ্রান্সকে সমর্থন দিয়েছেন।
ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া যে ফ্রান্সের সাথে করা সাবমেরিন চুক্তি বাতিল করে মার্কিন ও ব্রিটিশ প্রযুক্তিতে পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির চুক্তি করেছে তাতে তারা বিস্মিত।
ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লাইনও বলেছেন, ফ্রান্সের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
নেটো জোট গঠিত হয়েছিল মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নকে মাথায় রেখে, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন বিলুপ্ত। এখন সামরিক বা কৌশলগত জোটগুলোর মূল নজর এশিয়ার দিকে, এবং অনেকের মতে সেখানে প্রধান প্রতিপক্ষ হতে যাচ্ছে চীন।
সেকারণেই ম্যাক্রোঁ অনেক দিন ধরেই ইউরোপের স্বতন্ত্র পথে চলার কথা বলছেন, বলছেন ‘ইউরোপের কৌশলগত স্বাধিকার’ এবং ‘ইউরোপিয়ান সার্বভৌমত্বের’ কথা।
কোহেন বলছেন, চীনে জার্মানির বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে, এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন চীনের প্রতি যে নীতি নিয়েছেন, তাতে তারাও উদ্বিগ্ন। জার্মানির সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যেকার বাণিজ্যের চেয়েও বেশি। তাই ফ্রান্স ও জার্মানি মিলে চীনের প্রতি মিত্রতাপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে ।