এই সময়ে ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের যে ভিন্ন ও ব্যতিক্রমী ধারা তরতর করে সিনেমাপ্রমীদের মাঝে জায়গা করে নিচ্ছে, সেখানে মুষ্টিমেয় নামগুলোর মধ্যে আলোচিত এবং জনপ্রিয় একটি নাম সৃজিত মুখার্জি। খ্যাতনামা এ পরিচালক পাশাপাশি অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ও অর্থনীতিবিদ হিসেবেও সুপরিচিত।
পরিচালক হিসেবে কিছুদিন আগেই এক দশক পূর্ণ করেছেন সৃজিত। ২০১০ সালে ক্যারিয়ার শুরু তার, আর এই এগারো বছরে ১৮টি সিনেমা পরিচালনা করেছেন, যার ১২টিই বক্স অফিসে সফলতা পেয়েছে। এ ছাড়া ওটিটিতে অভিষেক ঘটেছে তার।
তার পরিচালিত সিনেমা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রায় ১৭৫টি পুরস্কার ঘরে তুলেছে। কয়েকবার পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তি সৃজিতকে এই সময়ের কলকাতার অন্যতম ও জনপ্রিয় নির্মাতার স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। আজ তার জন্মদিন।
১৯৭৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সৃজিতের জন্ম। বাবা সমরেশ মুখার্জি স্থাপত্যবিদ্যার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং মা শরীরবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সৃজিত প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক পাস করেন। পরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম ফিল ও পিএইচডি করেন। অর্থনীতিবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে কাজ করার সময় দিল্লিতে ইংরেজি সার্কিট থিয়েটারের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে যুক্ত হন। তারপরই সিনেমার প্রতি জন্মানো ভালোবাসা থেকেই এই মাধ্যমে আগমন। এবং প্রথম সিনেমাতেই তার সফলতা ‘এলেন, দেখলেন, জয় করলেন’ প্রবাদটির সঙ্গে মানিয়ে যায় অনেকভাবেই।
২০১০ সালে পরিচালনার মধ্যে দিয়ে রুপালি জগতে পদার্পণ করা সৃজিত মুখার্জি কলকাতার সিনেমাকে এক স্বতন্ত্র জায়গায় নিয়ে গেছেন। তিনি বাণিজ্যিক ও আর্ট দুই মাধ্যমের সংমিশ্রণে এক ভিন্নধারার সূচনা করেছেন বলা যায় নিঃসন্দেহে। একদিকে অটোগ্রাফ, বাইশে শ্রাবণ, চতুষ্কোণ, নির্বাক বা ভিঞ্চিদার মতো থ্রিলার, অন্যদিকে আছে রাজকাহিনী, এক যে ছিল রাজা, গুমনামীর মতো ইতিহাস নির্ভর ছবি। সেখানে ধরা পড়ে তার মুনশিয়ানা। সম্প্রতি ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ ওয়েব সিরিজেও সৃজিতের নির্মাণ প্রশংসিত। তার সিনেমায় ডায়ালগ, চিত্রনাট্য, গান, সিনেমাটোগ্রাফি ও দক্ষ শিল্পীদের অভিনয়ের দেখা মিলেছে সব সময়ই।
২০১০ সালে সৃজিতের প্রথম পরিচালনা ‘অটোগ্রাফ’ সিনেমাপাড়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর ২০১১ সালে নির্মাণ করেন ‘বাইশে শ্রাবণ’। এরপর একে একে হেমলক সোসাইটি, মিশর রহস্য, জাতিস্মর ও চতুষ্কোণ, নির্বাক, রাজকাহিনী, জুলফিকার, বেগমজান (হিন্দি), ইয়েতি অভিযান, উমা, এক যে ছিল রাজা, শাহজাহান রিজেন্সি, ভিঞ্চিদা, গুমনামী, দ্বিতীয় পুরুষ বা নেটফ্লিক্সের ‘রে’ অথবা হইচই-এর ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ প্রতিটি সিনেমা ও সিরিজেই ভিন্নতা ও নতুনত্ব দেখা গেছে।
বক্স অফিসে সফলতার পাশাপাশি স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন তিনি। ভারতের ৬১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সৃজিত পরিচালিত ‘জাতিস্মর’ চারটি পুরস্কার জিতে নেয়। পরের বছর জাতীয় পুরস্কারে ‘চতুষ্কোণ’-এর জন্য তিনি সেরা পরিচালক ও সেরা চিত্রনাট্য বিভাগে পুরস্কার জিতে নেন। তিনি সেই সময় এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘পুরস্কার-প্রত্যাশী হয়ে কোনোদিন সিনেমা তৈরি করিনি। আমি দর্শককে আমার ছবি দেখাতে চাই। নিজেকে আমি একজন কথক হিসেবেই দেখি। দর্শককে আমার গল্প শোনাতে চাই।’ আরও বলেন, পুরস্কার অবশ্যই একটা বাড়তি উদ্দীপনা দেয়। জাতীয় পুরস্কার তো বটেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই বলতে তিনি বোঝেন দর্শকদেরই।
২০১৮ সালের ৬৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তার পরিচালিত ‘এক যে ছিল রাজা’ আটটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জয় করে তাক লাগিয়ে দেয়। উল্লেখ্য যে, সিনেমাটি বাংলাদেশের ভাওয়াল রাজার সত্য কাহিনি নিয়ে নির্মিত।
সৃজিতের মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ সিনেমা ‘দ্বিতীয় পুরুষ’, এটি ২০১১ সালের ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর সিক্যুয়েল। সিনেমা রিলিজ করার পর বক্স অফিসে সুপারহিট তকমা তো পায়ই, সঙ্গে নির্মাতা হিসেবে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি।
এ কথা বলা যায় যে, ঋতুপর্ণ ঘোষের দেখানো পথে কলকাতার সিনেমায় যে কয়জন নির্মাতা সফল, তার মধ্য সৃজিত সবার ওপরে থাকবেন। তার সিনেমায় অভিনয় করে গত এক দশকে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, আবির চট্টোপাধ্যায়, অনির্বাণ চক্রবর্তী, যিশু সেনগুপ্ত বা ঋত্বিক চক্রবর্তীর মতো অভিনেতারা নিজেদের মেধার সঠিক ব্যবহার করতে পেরেছেন বললে ভুল হয় না। এমনকি সৃজিতের সিনেমার মধ্য দিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, গৌতম ঘোষ, অর্পণা সেনের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের নতুন ধারায় শক্তিশালী চরিত্রে দেখতে পেয়েছি। অভিনেত্রীদের মধ্যে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, রাইমা সেন, কোয়েল মল্লিক, সুস্মিতা সেন, স্বস্তিকা মুখার্জি ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ উপহার দিয়েছেন। আমাদের দেশের জয়া আহসান কলকাতায় প্রথমবারের মতো সাধারণ দর্শক এবং সমালোচক দুই ধারার মানুষের নজরে আসেন সৃজিতের ‘রাজকাহিনী’ সিনেমার মাধ্যমে। ‘ইয়েতি অভিযান’ ছবিতে দেখা যায় ঢাকার বিদ্যা সিনহা মিমকেও।
ভারতীয় চলচ্চিত্র বিশেষ করে বাংলাভাষী দর্শকদের কাছে অমর গোয়েন্দা চরিত্র ‘ফেলুদা’কে আবারও সেলুলয়েডে উপস্থাপন করছেন সৃজিত। ফেলুদা-জটায়ু-তোপসে এই তিন জনপ্রিয় চরিত্রে দেখা গেছে টোটা-অনির্বাণ-কল্পনকে। ফেলুদা চরিত্রে টোটা অভিনয় সবার কাছেই প্রশংসা পাচ্ছে।
সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-এর জন্য বাংলাদেশের মোহাম্মদ নাজিমউদ্দীনের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ অবলম্বনে ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করেছেন সৃজিত। আজমেরি হক বাঁধন, রাহুল বোস ও অনির্বাণকে নির্মিত এই সিরিজ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেলেও নির্মাণ প্রশংসা পেয়েছে। এখন তাপসী পান্নুকে নিয়ে হিন্দি ছবি ‘শাবাশ মিঠু’ নিয়ে ব্যস্ত। পাশাপাশি হাতে আছে মহানায়ক উত্তম কুমারকে নিয়ে নির্মিত ‘অতি উত্তম’।
সমসাময়িক শিবপ্রসাদ-নন্দিতা এবং কৌশিক গাঙ্গুলির সঙ্গে তাকে নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা চললেও বাস্তব জীবনে তারা সবাই ভালো বন্ধু। ব্যবসায়িক সফলতার দিক থেকে শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটি এগিয়ে আবার পুরস্কারে কৌশিক, তবে দুটোতেই এগিয়ে সৃজিত। নিজস্ব, ব্যতিক্রমী গল্প ও গল্প বর্ণনার ধরনে এই তিন নির্মাতা কলকাতায় চলচ্চিত্রকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আর প্রতিযোগিতা যেখানে সুস্থ ভালো ফলাফল সেখানে অবশ্যম্ভাবী।
পেশাগত জীবনে সফল মানুষটি ভালোবেসে বিয়ে করেন আমাদের বাংলাদেশের আলোচিত অভিনেত্রী রাফিয়াত রশিদ মিথিলাকে।
আশা করা যায়, নতুন জীবন, নতুন নতুন অনেক গল্প এবং নতুন সিনেমা নিয়ে ভালোই কাটছে সৃজিতের দিনকাল। এবং সামনে আরও অনেক ভালো ও মানসম্মত কাজ উপহার দেবেন তিনি।
আফজালুর ফেরদৌস রুমন: চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক