দিনাজপুরে গোপনে শত শত কৃষকের নামে মোবাইল সিম কিনে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা ঋণ তুলে তা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি এজেন্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। বীরগঞ্জে ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট সোলারগাঁও এগ্রো ইঞ্জিনিয়ার্স এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের এ অপকর্ম সামনে এসেছে মূলত ঋণ পরিশোধে কৃষককে ব্যাংক তাগাদা দেওয়ার পর। এতে জেলার কয়েকটি উপজেলার কয়েকশ’ কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ব্যাংক এশিয়া কর্র্তৃপক্ষ বলছে, এজেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাও পেয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর সম্প্রতি প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে সোলারগাঁও এগ্রো ইঞ্জিনিয়ার্স এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। পরে বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু রেজা মো. আসাদুজ্জামানকে ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে সোলারগাঁও এগ্রোর চেয়ারম্যান শাহ নোমান পার্থের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে প্রতিষ্ঠানের বীরগঞ্জ উপজেলার ব্যবস্থাপক বুলবুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আর্থিক অনিয়মের কারণে কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত ও তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়। এরপর তারা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করছে। কৃষকের নামে গোপনে সিম কিনে ঋণ অনুমোদন ও তা আত্মসাতের অভিযোগ মিথ্যা।’ তিনি আরও বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন আমাদের কাগজপত্র দেখতে চেয়েছে। সময়মতো তাদের সামনে সব কাগজপত্র হাজির করব। আমরা যেসব কৃষকের ঋণ পাস করেছি, তা তাদের দিয়েছি। এখন তারাও নিয়মিত ঋণের টাকা ফেরত দিচ্ছেন।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, সোলারগাঁও এগ্রোর প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে। মূলত কৃষকদের মধ্যে গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ বিতরণ ও বিক্রি করে তারা। এই ব্যবসাকে পুঁজি করে বীরগঞ্জে সোলারগাঁও এগ্রো নামে ব্যাংক এশিয়ার একটি এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কৃষকদের নামে কৃষি ঋণ অনুমোদন হলেও সেই টাকা কৃষককে দেয়নি সোলারগাঁও এগ্রো। এমনকি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের নানা অনিয়মের প্রতিবাদ করায় আটজনকে চাকরিচ্যুত করে প্রতিষ্ঠানটি। সোলারগাঁও এগ্রো ক্রেতা ও সুবিধাভোগীদের ব্যাংকঋণ দেওয়ার নামে তা আত্মসাৎ করেছে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন শাহ নোমান পার্থ।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, সোলারগাঁও এগ্রো ইঞ্জিনিয়ার্স এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড ব্যাংক এশিয়ার মাধ্যমে কৃষকদের কৃষিঋণ দেওয়ার কথা বলে তাদের অগোচরে একটি করে নতুন সিম নিবন্ধন করে। পরে সেই নম্বরের বিপরীতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করা হয়। কার্যালয়েই এসব সিম চালু রাখার ব্যবস্থা করে। প্রত্যেক কৃষকের বিপরীতে ৫০ হাজার টাকা করে ঋণ পাস করা হলেও হাতেগোনা কয়েকজনকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট কৃষককে ঋণের ৫০ হাজার টাকা পরিশোধে চাপ দিচ্ছে ব্যাংক এশিয়া। অনেক কৃষকের নামে ঋণ পাস হলেও তিনি কিছুই জানেন না। হঠাৎ ঋণ পরিশোধের তাগাদা দেওয়ায় তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। এভাবে সোলারগাঁও এগ্রো জেলার বীরগঞ্জ, কাহারোল, বিরল, খানসামা, বোচাগঞ্জ ও পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার কয়েকশ’ কৃষককে ঠকিয়ে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।
কাহারোল উপজেলার উত্তর নওগাঁ গ্রামের ডিপ অপারেটর সমারু মালাকার দেশ রূপান্তরকে জানান, গত বছরের শুরুতে সোলারগাঁও এগ্রোর লোকজন তার জমিতে একটি গভীর নলকূপ বসানোর জন্য আসেন। পরে তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী তারা জমি থেকে ১৫ শতক বাবদ বাৎসরিক ২০ হাজার টাকা লিজ দেবে। প্রতি মাসে তাকে তিন হাজার টাকা বেতন ও পাম্প থেকে আয়ের ২০ শতাংশ কমিশন দেবে। দুই মাস পর বেতন বন্ধ করে দেয়। পরে সোলারগাঁও এগ্রোর লোকজন তার কাছ থেকে ঋণ দেওয়ার কথা বলে ৮০ কৃষকের তালিকা নেয়। তালিকা ধরে প্রত্যেক কৃষকের আঙুলের ছাপ ও তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর নেওয়া হয়।
অনেক পরে তিনি জানতে পারেন, সবার অগোচরে সেই আঙুলের ছাপগুলোর বিপরীতে নতুন সিম নিবন্ধন করা হয়েছে। ৮০ জনের মধ্যে মাত্র ১০ জন কৃষককে ১০ হাজার টাকা করে ঋণ দেওয়া হয়। ঋণ মঞ্জুর হলেও তারা মোবাইলে কোনো মেসেজ পাননি। অবশ্য কৃষকরা পরে এ ঋণ পরিশোধ করেছেন। কিন্তু বাকি কৃষকরা কোনো টাকা না পেলেও নিজেদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ৫০ হাজার টাকা ঋণ পরিশোধের মেসেজ পেয়েছেন এবং বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। সবারই এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে বলে জানান তিনি।
এভাবে কাহারোল উপজেলার শংকরপুর গ্রামের পাম্প অপারেটর জুয়েল ইসলামের মাধ্যমে ৬০, মাধবগাঁও গ্রামের পাম্প অপারেটর যতীশ চন্দ্র রায়ের মাধ্যমে ৯০, রসুলপুর গ্রামের পাম্প অপারেটর রহিদুল ইসলামের মাধ্যমে ৩০ জনসহ বিভিন্ন উপজেলায় পাম্প অপারেটদের মাধ্যমে কয়েকশ’ কৃষকের নামে ঋণ পাস করে সেই টাকা মেরে দিয়েছে সোলারগাঁও এগ্রো।
এসবের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট সোলারগাঁও এগ্রো ইঞ্জিনিয়ার্স এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের কালেকশন অ্যান্ড লোন রিকোভারি অফিসার পদের আটজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর মধ্যে গত ১৯ আগস্ট চাকরিচ্যুত করা হয় মো. জীবন, শামীম ইসলাম, বিল্লাল আলী, আল মামুন ও নুরুল ইসলামকে। আগে ছাঁটাই করা হয়েছিল আবদুল্লাহ আল মামুন, ফাতাউর ইসলাম ও আবুল বাসারকে।
চাকরিচ্যুত এসব কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা প্রথমে নিরীহ কৃষকদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কৃষিঋণ প্রস্তাব করান। এ সময় কৃষকদের অগোচরে তাদের নামে একটি মোবাইল সিম নিবন্ধন করে সোলারগাঁও এগ্রো সেটি নিজের হেফাজতে রাখে। প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে বাটন মোবাইলে সিমগুলো সচল রাখা হয়। কৃষকদের নামে ব্যাংক এশিয়া ঋণ পাস করার পর সিমগুলোতে মেসেজ যায়। অথচ কৃষককে জানানো হয় তাদের নামে কোনো ঋণ পাস হয়নি। আবার কাউকে কাউকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। বাকি টাকা সোলারগাঁও এগ্রো কর্র্তৃপক্ষ আত্মসাৎ করছে বোঝার পর প্রতিবাদ জানান তারা। পরে বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বেতনসহ পাওনাদি কিছুই দেওয়া হয়নি।
বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু রেজা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘কৃষকের নামে ঋণ করে আত্মসাতের অভিযোগ আসার পর জেলা প্রশাসক ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি ইতিমধ্যে তদন্তের কাজ শুরু করেছি। সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলছি। শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’
বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল কাদের বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে ব্যাংক এশিয়া দিনাজপুর শাখার ব্যবস্থাপক চঞ্চল কুমার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বীরগঞ্জ এজেন্ট সোলারগাঁও এগ্রোর বিরুদ্ধে সম্প্রতি বেশকিছু অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানিয়েছি। তারা অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিনা জামানতের এ ঋণ আমরা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের দিয়ে থাকি। এখানে আমি নতুন এসেছি। ফলে ঋণ বিতরণের সময় সেখানে ব্যাংকের দিনাজপুর শাখার কোনো প্রতিনিধি ছিলেন কি-না তা খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব।’