হৃদয়ে বাংলাদেশ

বিগত পাঁচ দশকে স্বাধীন বাংলাদেশে সার্বিক সামাজিক পরিবেশে বুদ্ধি, বিনোদন, শিক্ষা-সংস্কৃতি চর্চার যে বিকাশ ঘটেছে, যে সংস্কার সাধিত হয়েছে, আমজনতার মণশচক্রবালের প্রসার ঘটেছে সেখানে মিডিয়া অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশে  প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া যুগোপযোগী ভূমিকা পালনে দৃঢ়চিত্ততা প্রদর্শনে সবসময় সক্ষম না হলেও কখনো পিছপা হয়নি। সংবাদ মুদ্রণ ও সম্প্রচারে, সৃজনশীল সাহিত্য রচনা পৃষ্ঠপোষকতায়, অর্থনীতির সহজ সরল ব্যাখ্যায়, রাজনীতির গতিবিধি তুলে ধরায়, সুস্থ বিনোদন বিতরণে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়েও প্রযুক্তি ও প্রক্ষেপণ দক্ষতায় অনেকটা এগিয়েছে বাংলাদেশের মিডিয়া। ইলেকট্রনিক যে মিডিয়া বাংলাদেশের মানুষের মননে মেধায়, আর্থসামাজিক প্রাগ্রসরমানতায় প্রযতœ প্রেরণা সঞ্চার করেছে সবচেয়ে বেশি সেটি চ্যানেল আই। আজ পহেলা অক্টোবর। চ্যানেল আই-এর জন্মদিন।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকার চ্যানেল আই-সহ তিনটি স্যাটেলাইট চ্যানেলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।  সে বছর, চ্যানেল আই যখন ইমপ্রেস পরিবারের ধারণার অবয়বে, ব্যবসা কাম বেড়ানো উপলক্ষে জাপানে এসেছিলেন মমতাময়ী মা সৃজনশীল লেখিকা রাবেয়া খাতুন, ছেলে-মেয়ে, পুত্রবধূ নাতি-পুতি সবাইকে নিয়ে। আমি তখন জাপানে বাণিজ্যদূতের দায়িত্বে। খুঁটিনাটি অনেক বিষয় নিয়ে মতবিনিময়, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ আর অনুষ্ঠানাদি বিনিময়ের সম্ভাবনা শর্তসাবুদ নিয়ে। চ্যানেল আই-এর সঙ্গে বড্ড নিয়মিত হয়ে পড়ি এনবিআরের চেয়ারম্যান থাকার সময় থেকে দেশের উন্নয়ন, ব্যবসা বিনিয়োগ ও রাজস্ব অর্থনীতির বিষয়ে চ্যানেল আই  পর্যালোচনার পর্ব শুরু করলে।   

১৯৯৯-এর ১ অক্টোবর চ্যানেল চোখ মেলে তাকায়। তার নাম দ্ব্যর্থ (দুই অর্থ) বোধক। আই মানে আমি, আবার আই মানে চোখ। আমার ও আমাদের হৃদয়ে বরাবরই বাংলাদেশ। চোখ দিয়ে দেখি যে বাংলাদেশকে। চিন্তা-চেতনায় মননে ভাব-ভাবনা প্রকাশে চ্যানেল আই এই দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে তার ক্যামেরার চোখে, প্রক্ষেপণে, বাকপ্রতিমায় তা প্রতিবিম্বিত প্রতিফলিত ও প্রকাশ করে চলেছে। সত্যান্বেষী প্রতিষ্ঠান ‘পরিপ্রেক্ষিত’ তিনটি শব্দে চ্যানেল আই-এর আদর্শ চিত্রায়িত করেছে : সাহসী, সন্ধানী ও সমকালীন। শতভাগ পেশাদারিত্ব, নতুনত্ব, সৃজনশীলতা ও তারুণ্যের জয়গান গেয়েই চ্যানেল আই-এর অভিযাত্রা। চ্যানেল আই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক বিকাশ, খাদ্য নিরাপত্তায় শতভাগ স্বনির্ভরতা অর্জন তথা বাংলাদেশের গঠনমূলক পরিবর্তনের সরব সঙ্গী। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও আকাশ সংস্কৃতির নতুন নতুন অগ্রযাত্রার ভেতর চ্যানেল আই’র পথচলা নতুন নতুন উদ্ভাবনের ভেতর দিয়ে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক সব শাখাকে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে সব শ্রেণির বাংলাভাষী মানুষের কাছে আরও বেশি জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারার গৌরব করতে পারে চ্যানেল আই।

বাংলা ভাষার প্রথম ডিজিটাল টিভি মাধ্যম বাংলাদেশের চ্যানেল আই। তারুণ্যকে ছাপিয়ে মেধার দ্যুতি ছড়িয়ে পৃথিবীব্যাপী দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে চ্যানেল আই। বাইশ বছরে সে হয়ে উঠেছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের আয়না। দেশ-বিদেশের কোটি কোটি বাংলাভাষী মানুষের ধারণা চ্যানেল আই-এর সঙ্গে থাকলেই দেশমাতৃকাকে অন্তর দিয়ে অনুভব করা যায়, সময়কে ধারণ করে নির্বিঘেœ পথ চলা যায়, রক্ষা করা যায় আধুনিক দুনিয়ার সঙ্গেও সহজে যোগসূত্র। চ্যানেল আই-ই বাংলাদেশের একমাত্র টিভি চ্যানেল যেখানে গত বাইশ বছর ধরে শুধু বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয়েছে। চ্যানেলটির প্রতিটি অনুষ্ঠানে দেশ ও মাতৃভাষাকে গৌরবের সঙ্গে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে। এনবিআরে একদিন নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বললাম ‘আমরা কর ফাঁকিবাজদের ঈযধংব করব’। সন্ধ্যায় চ্যানেল আইয়ের স্ক্রলে দেখলাম ‘কর ফাঁকিবাজদের ধাওয়া করা হবে’। চেইজ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ধাওয়া করা হয়তো ঠিক আছে কিন্তু কর ফাঁকিবাজদের ধাওয়া করা প্রতীকে প্রণালী পদ্ধতি অনুযায়ী মানানসই হয় না। ফোন করলাম বার্তা সম্পাদক শাইখ সিরাজ সাহেবকে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে শব্দটিকে শোভনীয় আকারে পরিবর্তন করে দিলেন। বছর দেড়েক আগে ‘বাংলাবিদ’ নামের যে শো-টি চলেছিল তাতে বাংলা ভাষার প্রয়োগ, সংগীতসহ শব্দচর্চা, ভাষা ও সাহিত্যের নানান প্রসঙ্গ উঠে আসত। বড় পুষ্টিকর ও শিক্ষণীয় অনুষ্ঠান ছিল এটি।

চ্যানেল আইতে দিন শুরু হয় ‘গানে গানে সকাল’ মঞ্চের পেছনে গ্রামবাংলার অপরূপ দৃশ্য। নবীন-প্রবীণ শিল্পীর কণ্ঠে মায়ায় জড়ানো সুমধুর বাংলা গান। অপূর্ব আয়োজন। এই নান্দনিক আয়োজন দেখে দেশের অধিকাংশ অগ্রসরমাণ পরিবারে সকাল শুরু হয়। রাতদিন ২৪ ঘণ্টা নানামুখী দর্শকনন্দিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে চ্যানেল আই। চ্যানেল আই-এর সংবাদ দর্শকের অন্যতম আগ্রহের বিষয়। বিভিন্ন রিয়েলিটি শো, বিনোদনমূলক নানা অনুষ্ঠান, সিনেমা, নাটক, টেলিফিল্ম প্রচারের ক্ষেত্রেও চ্যানেল আই স্বতন্ত্র।

চ্যানেল আই যে কোনো অনুষ্ঠান প্রচারের আগে দেশের কথা ভাবে। কৃষিই বাংলাদেশের প্রাণ, কৃষি শুধুমাত্র একটি কাজই নয় বরং এটা জীবন ধারণের একটি পথ। প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের নিয়ে অনুষ্ঠান করার কৃতিত্ব চ্যানেল আই-এর। গণমাধ্যমে দেশের কৃষি ও কৃষকের কথা তুলে ধরার মূল রূপকার শাইখ সিরাজ এক সময় বিটিভিতে ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের কৃষিক্ষেত্রে যে জাগরণের ডাক দিয়েছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে চ্যানেল আইতে শুরু করেন ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ নামের নতুন অনুষ্ঠান। চ্যানেল আই-এর হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের প্রভাবে দেশের কৃষি ও কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কৃষি বাজেট প্রণয়নে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকও এখন তার ন্যায্য দাবির কথা সহজেই বলতে পারছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অথবা দপ্তরে! ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া, কৃষকের জীবনমানের উন্নয়নসহ কৃষিক্ষেত্রে নানামুখী পরিবর্তন শুরু হয়েছে হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের প্রভাবে। প্রতি ঈদে কৃষকের ঈদ অনুষ্ঠান প্রচার হয় চ্যানেল আইতে। ছাদ কৃষিতে নতুন উদ্দীপনা শুরু করতে পেরেছে চ্যানেল আই। 

চ্যানেল আইতে ‘প্রকৃতি ও জীবন’ অনুষ্ঠানটি সব বয়সী মানুষের অনেক পছন্দ। অনুষ্ঠানের আওতায় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতি বছর প্রকৃতি মেলার আয়োজন ও গুণীজনের হাতে প্রকৃতি পদক তুলে দেওয়া হয়। দেশের স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের হাতে অনুষ্ঠানের সিডি পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচিও অব্যাহত রেখেছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন। দেশের মানুষ প্রকৃতি রক্ষায় সচেতন হচ্ছে। ‘আজকের সংবাদপত্র’, ‘সংবাদপত্রে বাংলাদেশ’, ‘তৃতীয় মাত্রা’ জনপ্রিয় টকশো।

জিল্লুর রহমান তৃতীয় মাত্রার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। তৃতীয় মাত্রার মুক্ত আলোচনায় দেশ সমাজ ও  রাজনৈতিক অর্থনীতির নানান বিষয় দেশের প্রাজ্ঞজনের প্রাঞ্জল বাকপ্রতিমায় উঠে আসে। মুক্তবুদ্ধি যুক্তি তর্কানুমোদিত বক্তব্য শেষে সঞ্চালকের সরলীকৃত উপসংহার টানার পারঙ্গমতা তৃতীয় মাত্রাকে বিশেষ মাত্রায় উন্নীত করে। কয়েকটি  ঈদে রাজনীতিবিদদের নিয়ে ‘ভালোবাসার বাংলাদেশ’ নামে যে বিনোদন কাম বুদ্ধিরস সিঞ্চিত অনুষ্ঠান করা হয়, তাতে দেশের আবহমান ঐতিহ্য বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। তৃতীয় মাত্রা চ্যানেল আই-এর অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নতুন নতুন চিন্তাভাবনার মাত্রা যুক্ত করে।

চ্যানেল আই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন বিশেষ করে, নাটক, সিনেমা ও সংগীতের অঙ্গনে এখন যারা মেধার দ্যুতি ছড়িয়ে চলেছেন তাদের অধিকাংশই চ্যানেল আই-এর বিভিন্ন রিয়েলিটি শো থেকে উঠে এসেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে রবীন্দ্র মেলা, জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মদিনে নজরুল মেলা, বাঙালির নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উন্মুক্ত চত্বরে হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণসহ নানা ধরনের মেলার আয়োজন করে চ্যানেল আই প্রতিনিয়ত দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে ভূমিকা রাখছে। চ্যানেল আই নিয়মিত দেশের গুণীজনদের জন্মদিন পালন করে থাকে। চ্যানেল আই সংগীত পুরস্কার, চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ, খুদে গানরাজ, লাক্স চ্যানেল আই সুপার স্টার, আবৃত্তি ছন্দে আনন্দে, চ্যানেল আই সেরা নাচিয়ে অনুষ্ঠানগুলো স্বনামেই খ্যাত হয়ে উঠেছে। প্রতি বছরই চ্যানেল আই-এর কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগ। সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বের করে আনা হচ্ছে গুণীমুখ। চ্যানেল আই এদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বহুসংখ্যক গুণী শিল্পীকে আজীবন সম্মাননা দিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতাও অব্যাহত রেখেছে। চ্যানেল আই দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুস্থ শিল্পীকেও আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। দেশের চলচ্চিত্রের বিকাশে ইমপ্রেস ও চ্যানেল আই-এর অবদান অনেক। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক সিনেমা নির্মাণ করেছে। চলচ্চিত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরস্কার অর্জনের ক্ষেত্রে ইমপ্রেসই আছে এগিয়ে।

টেলিভিশন মানে শুধু বিনোদন নয়। টেলিভিশন মানে জনকল্যাণ, টেলিভিশন মানে মানবসেবা, টেলিভিশন মানে জাতির উন্নয়ন ও ক্রমবিকাশের অনন্য বাহন। একটি টেলিভিশন চ্যানেল হতে পারে সমাজের অনেক ভালো ও শুভ ঘটনার নেপথ্য শক্তি। টেলিভিশন চ্যানেল মানুষকে আরও সক্রিয় করতে পারে দেশের পথে। আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে এই বিশ্বাস থেকে চ্যানেল আই কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রাইভেট স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল চ্যানেল আই-কে অভিনন্দন।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান