খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছে রাবি ভর্তিচ্ছুরা

করোনা মহামারির দীর্ঘদিন পর স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন বিভাগ ইতিমধ্যে একাডেমিক ক্লাস পরীক্ষা নেওয়া শুরু করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় শুরু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে নগরীতে ভিড় জমাচ্ছে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী। অপরদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলসমূহ এখনো বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছে ভর্তিচ্ছুরা। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকাগুলো ও নগরীর হোটেলগুলোতে বেশ কিছু শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা হলেও অনেককেই খোলা আকাশের নিচে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে।

কুমিল্লা থেকে স্বপ্না নামের এক নারী শিক্ষার্থী ও তার বাবা আসেন রাজশাহী। রাত ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছান তারা। রাজশাহীতে পরিচিত কেউ না থাকায় সকাল পর্যন্ত সেখানেই বাবা-মেয়ে অপেক্ষা করেন। যত কষ্টই হোক না কেন মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাক এমন স্বপ্নই এই বাবার।

বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে জানা গেছে, পরীক্ষা উপলক্ষে রবিবার সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে ভর্তিচ্ছু ও তাদের অভিভাবকেরা আসতে শুরু করেন। অনেকেই পরিচিত জনদের কাছে এসে উঠেছেন। আর যারা মেস কিংবা হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করতে পারেননি তারা বাসস্ট্যান্ড ও স্টেশনে বসে থেকে এবং আশপাশের মসজিদগুলোতে কোনো রকমে রাতটা পার করেছেন।

সোমবার দুপুরে ক্যাম্পাসে কথা হয় আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। মেয়েকে পরীক্ষার হলে ঢুকিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। বলছিলেন, রাজশাহীতে পরিচিত কেউ নেই। ভেবেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালে একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে। কিন্তু পৌঁছতেই অনেক রাত হয়ে যায়। তাই বাসস্ট্যান্ডেই ছিলাম। সেখানে আমার মত বেশ কয়েকজন ছিল। তবে যত কষ্টই হোক না কেন, মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে এটাই স্বপ্ন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়। এ বছর তিনটি ইউনিটে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৪৬ জন। এদের অনেকের সঙ্গেই আছেন অভিভাবক। সব মিলিয়ে অন্তত দু’লাখ মানুষের সমাগম হয়েছে রাজশাহীতে।

আরও জানা গেছে, পর্যাপ্ত হোটেল ও মেসে সিট না থাকা এবং আবাসিক হলসমূহ বন্ধ থাকায় এ বছর ভর্তিচ্ছু ও অভিভাবকদের আবাসন সংকট চরমে। যেসব হোটেল রয়েছে সেগুলো অনেক আগেই বুকিং হয়ে গেছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি ছাত্রী হলের কমন রুম, রিডিং রুম, টিভি রুমগুলোতে ভর্তিচ্ছু ছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করে প্রশাসন। এতে অন্তত তিন হাজার ছাত্রীর থাকার ব্যবস্থা হয়।

তবে হলে প্রবেশের জন্য সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। তাই যারা নির্দিষ্ট এই সময়ের মধ্যে উপস্থিত হতে পারেননি তাদের ওই অবস্থাতেই রাত কাটাতে হয়েছে। ক্যাম্পাসের মসজিদে কথা হয় নীলফামারী থেকে আসা ভর্তিচ্ছু আলমগীর ও তার বন্ধু শাকিলের সঙ্গে। রবিবার রাতে রাজশাহীতে পৌঁছেছেন তারা। রাত করে কোনো জায়গা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের মহাসড়কের ফুটপাতে পেপার বিছিয়ে বসে থেকে রাত পার করেছেন তারা।

জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় আবাসিক হলসমূহ খোলা সম্ভব হচ্ছে না। রাজশাহীতে মেস ও হোটেলগুলো মিলিয়ে মোটামুটি ৭০ শতাংশ ভর্তিচ্ছু ও অভিভাবকদের থাকা সম্ভব। বাকিদের আত্মীয়-স্বজন কিংবা অন্য যেকোনো ভাবে থাকতে হবে।

মেস মালিক সমিতির সভাপতি এনায়েতুর রহমান জানান, হল বন্ধ থাকায় হলের শিক্ষার্থীরাও এখন মেসে থাকছে। তাই সিট সংকট দেখা দিয়েছে। আর ভর্তিচ্ছুদের কষ্টের কথা ভেবে এ বছর মেসগুলোতে থাকার জন্য কোনো টাকা নেওয়া হচ্ছে না। অভিভাবকেরা থাকলে দু’শ থেকে পাঁচ’শ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হবে।

 তবে পৌঁছাতে গভীর রাত হওয়ায় এসব মেসগুলোতেও যোগাযোগ করতে পারেননি অনেকেই।

এদিকে, সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায়, দুপুর ১২টা ও বিকেল ৩টায় তিনটি শিফটে সি ইউনিটের (বিজ্ঞান) ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই ইউনিটে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৪ হাজার ১৮৮ জন। এর মধ্যে দশ হাজার ৭৪১ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। এতে শতকরা অনুপস্থিতির হার ২৪.৩৩ শতাংশ। মঙ্গলবার (০৫ অক্টোবর) এ ইউনিটের (মানবিক) পরীক্ষা এবং আগামী বুধবার (৬ অক্টোবর) তিনটি শিফটে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

প্রথম দিনের পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভর্তি পরীক্ষার সময় আবাসনের সমস্যা হয়ে থাকে। ভর্তিচ্ছু ছাত্রীদের ভোগান্তির কথা ভেবে ছাত্রী হলগুলোতে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর মেসগুলোতে ফ্রি থাকতে পারে সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।