সাফ অভিযানের মাত্র সাত দিন আগে জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে অস্কার ব্রুজন বলেছিলেন, ‘আমি জাদুকর নই যে এত কম সময়ে সব বদলে ফেলব। তবে আমি চেষ্টা করব ফুটবলারদের মানসিকতা ও খেলার ধরনে কিছু পরিবর্তন আনতে।’ সাফে দু’ম্যাচ শেষে লাল-সবুজের নয়া হেডমাস্টারের বলা কথাগুলো খুব মিলে যাচ্ছে। কঠিন এই অভিযান শুরুর আগে দল নিয়ে কাটিয়েছেন মাত্র আটটি ট্রেনিং সেশন। তাতেই দলের মানসিকতায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে শুরুর পর দ্বিতীয় ম্যাচে প্রবল প্রতিপক্ষ ভারতের সঙ্গে ড্রয়ে ফাইনালের পথে ভালোভাবেই আছে বাংলাদেশ। অথচ তিন মাস আগেই ভারতে রীতিমতো থরথরিয়ে কেঁপেছে বাংলাদেশ। কঠিন এক ম্যাচ শেষের ১৫ ঘণ্টার মধ্যেই ব্রুজন শুরু করেছেন মালদ্বীপবধের প্রস্তুতি। এ নিয়ে ফুটবলারদেরও খুব একটা অভিযোগ নেই। বরং কোচের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালনেই তারা মগ্ন। এই কোচ যে তাদের কাছে ঠিক হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো। যার বাঁশির সুরে মোহিত হয়ে তারা খেলছে অন্য ধারার ফুটবল। তাই কোচের গুণকীর্তনে কুণ্ঠা নেই ফুটবলারদের।
পায়ে হালকা ব্যথা বলে কাল বিশ্রামে ছিলেন তপু বর্মণ। এক পাশে বসে সতীর্থদের অনুশীলন দেখতে দেখতেই বললেন ‘জানেন, একটা বিশ্বাস সবার মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে এখন। তা হলো অতীতে যা হয়নি এবার তা হয়ে যাবে। মন-মাথা দুই-ই এটা বলছে। শুধু আমাকে নয়। দলের প্রত্যেককে। আর এই বিশ্বাসটা সবার মনে গেঁথে দিয়েছেন কোচ।’ তপুর মতো কিপার আনিসুর রহমান জিকোও মজেছেন ব্রুজনে। আর ব্রুজন কী বলছেন জানেন? তার একটাই কথা, ‘আমি কিছু করিনি। যা করার ওরাই করছে। ওরাই নিজেদের বদলে ফেলেছে। আমি শুধু ওদের একটু সহায়তা দিচ্ছি, এই যা।’
না, বাংলাদেশ এখনো অনেক বড় কিছু করে ফেলেনি। প্রথম দু’ম্যাচে অপরাজিত থেকে চার পয়েন্ট নিয়ে তারা নিজেদের স্রেফ টিকিয়ে রেখেছে ফাইনালের রেসে। লক্ষ্যে পৌঁছতে স্বাগতিক মালদ্বীপ আর প্রথম দুই ম্যাচ জয়ী নেপালের বাধা পাড়ি দিতে হবে। ধাপে ধাপে গুছিয়ে ওঠা দলটিকে আগামীকাল মোকাবিলা করতে হবে স্বাগতিক মালদ্বীপের। বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা ভালো খেলেও প্রথম ম্যাচে হেরে গেছে নেপালের কাছে। তাই লড়াইয়ে টিকে থাকতে স্বাগতিকরা মরিয়া। কিন্তু এই বাংলাদেশ খোলস ঝেড়ে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। এদের তাই চাইলেই হারানো সম্ভব নয়। এমনটাই মানেন ভারতের বিপক্ষে তিনটি অসাধারণ সেভ করা কিপার জিকো, ‘আমরা কিন্তু এখন অনেক ইতিবাচক ফুটবল খেলছি। পাসিং ফুটবল খেলার চেষ্টা করছি। সেই আত্মবিশ্বাসটা আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। সামনেও এভাবে খেলতে চাই। ভারত র্যাংকিংয়ে আমাদের চেয়ে অনেক ভালো দল। আমরাও ম্যাচে অনেক সুযোগ তৈরি করেছি। সেগুলো কাজে লাগলে হয়তো আমরাই জিততাম। ১০ জন নিয়েও খুব ভালো খেলেছি। সামনে মালদ্বীপের বিপক্ষে ম্যাচ। ধারাবাহিকতা ধরে রেখে আরও ভালো খেলাই আমাদের লক্ষ্য।’
গত ক’বছরে মালদ্বীপের আক্রমণভাগ এ সময়ে এ অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগ হিসেবে পরিণত। আলি আশফাকদের রুখতে তাই ভুল করার সুযোগ নেই বাংলাদেশের। জিকো অবশ্য বিষয়টাকে দেখছেন অন্যভাবে, ‘মালদ্বীপের আক্রমণভাগ অনেক শক্তিশালী। তবে ওদের রক্ষণভাগ আমাদের মতো ভালো নয়। ওদের ভুলগুলো কাজে লাগাতে পারলে আমরাই জিতব। ওদের আক্রমণভাগকে সুযোগ না দিলে ওদের রক্ষণকে আমরা আতঙ্কে রাখতে পারব। আসলে দলকে এই আত্মবিশ্বাসটা দিয়েছেন আমাদের কোচ। তিনি সব সময় বলছেন, নিজেদের সেরা মনে করে খেলো। ইতিবাচক থাকো। মনে করো তোমাদের চেয়ে কেউ ভালো নয়।’
ম্যাচের আগের দিন কথা বলতে হবে বলে কাল মাইকের সামনে দাঁড়াননি ব্রুজন। তবে অনুশীলনের ফাঁকে কপালে আঙুল ছুঁইয়ে একটা কথাই বলেছেন, ‘এখন সব কিছুই হচ্ছে এখান থেকে। ছেলেরা ভাবনায় পরিবর্তন আনতে পেরেছে বলেই বিশ্বাসটা জোরালো হয়েছে।’ এই মনোভাবটা যদি অটুট থাকে, তবে ভারত মহাসাগর চিরে গড়ে ওঠা মালেতে লেখা হতে পারে নতুন ইতিহাস। যার রংটা হবে শুধুই লাল-সবুজ।