অতিরিক্ত পারিবারিক বিধি-নিষেধে বাসা থেকে পালায় ৩ ছাত্রী: র‌্যাব

রাজধানীর পল্লবী থেকে নিখোঁজ হওয়ার ৬ দিন পর তিন কলেজ ছাত্রীকে আবদুল্লাহপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে র‌্যাব। বুধবার সকালে তাদের উদ্ধার করা হয়। র‌্যাবকে ওই তিন ছাত্রী জানিয়েছে, অতিরিক্ত পারিবারিক বিধি-নিষেধের ফলে তারা পরিবারের প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়ে। তাদের নিজেদের পরিবারের নিয়মকানুন ভালো লাগত না এবং এসব সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়ম কানুন তাদের কাছে অত্যাচার মনে হতো।

র‌্যাব জানায়, ওই তিন ছাত্রী পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট ছিল। স্বাধীন জীবন-যাপন ও উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়ে জাপান যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। এ কারণে তারা বেশ কিছুদিন ধরে জাপানের ভাষা শিখেছিল। এ সুযোগে হাফসা নামের এক নারী তাদের সমুদ্র পথে জাপান নেওয়ার কথা বলে কক্সবাজার নিয়ে যায়। তবে সেখানে হাফসার সহযোগীরা ওই তিন কলেজ ছাত্রীর কাছে থাকা স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা হাতিয়ে নিলে তাদের হুঁশ হয়। পরে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেও র‌্যাব উদ্ধার করে তাদের। 

গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর পল্লবী এলাকার নিজ নিজ বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তিন কলেজছাত্রী। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তারা স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও সার্টিফিকেট নিয়ে যায়। এ ঘটনায় নিখোঁজ একজনের বড় বোন বাদী হয়ে গত ২ অক্টোবর পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অপহরণের মামলা করেন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় নাম উল্লেখ থাকা আসামি মো. তরিকুল্লাহ (১৯), মো. রকিবুল্লাহ (২০), জিনিয়া ওরফে টিকটকার জিনিয়া রোজ (১৮) ও শরফুদ্দিন আহম্মেদ অয়নকে (১৮) গ্রেপ্তার করে পল্লবী থানা-পুলিশ।

তবে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। 

তিন ছাত্রী মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৯ টার দিকে ছদ্মবেশে কক্সবাজার থেকে বাসযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করে। প্রাপ্ত গোপন তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব-৪ এর একটি অভিযানকারী দল গতকাল ভোরে আবদুল্লাহপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে নিখোঁজ ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করে। 

উদ্ধারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে র‌্যাব জানায়, উদ্ধার তিনজন একে অন্যের বান্ধবী এবং তারা মিরপুরের স্থানীয় কলেজে লেখাপড়া করে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আসক্ত হয়ে পড়ে তারা। দিনদিন লেখাপড়ার প্রতি তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। যার ফলে তাদের পরিবার পড়াশোনার জন্য ও ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলার জন্য চাপ দিত। অতিরিক্ত পারিবারিক বিধি-নিষেধের ফলে তারা পরিবারের প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়ে। তাদের নিজেদের পরিবারের নিয়মকানুন ভালো লাগত না এবং এসব সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়ম কানুন তাদের কাছে অত্যাচার মনে হতো।

র‌্যাব আরও জানায়, ওই তিন ছাত্রী মূলত উচ্চাভিলাষী জীবন-যাপন পছন্দ করত। দীর্ঘদিন বাসায় আবদ্ধ থাকার সময় তারা পশ্চিমা সংস্কৃতি বিশেষ করে জাপানি সংস্কৃতির প্রতি আসক্ত হয়ে পরে। তারা অধিক পরিমাণে জাপানি সিনেমা-সিরিয়াল, সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম দেখে দেখে জাপানি ভাষায় কিছুটা আয়ত্ত করে নেয়। তারা দেশ ছেড়ে স্বাধীন জীবন-যাপন ও উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে জাপান যাওয়ার পরিকল্পনা করার কারণ হিসেবে জাপানি সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষের সম-অধিকার, স্বাধীনতা, দত্তক হওয়ার সুযোগ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক বিধি-নিষেধ না থাকার কারণ উল্লেখ করে।

এর ফলে গত ২ মাস আগে তিন বান্ধবী তাদের বন্ধু তরিকুলের সঙ্গে দিয়াবাড়ী এলাকায় ঘুরতে যায়। সেখানে গিয়ে হাফসা চৌধুরী নামের ২৪ থেকে ২৫ বছর বয়সের এক নারীর সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। হাফসার সঙ্গে আলোচনার একপর্যায়ে তারা জাপানে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে হাফসা চৌধুরী তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। তিন বান্ধবী হাফসার সঙ্গে পরিকল্পনা করে কক্সবাজার রুট দিয়ে নৌপথে জাপান যাওয়ার কথা বলে।

যেভাবে পালিয়েছিল তিন ছাত্রী

র‌্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রিকশা যোগে প্রথমে গাবতলী যায়। হাফসার পরামর্শে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যেন তাদের অবস্থান চিহ্নিত না করতে পারে সে জন্য তারা নিজেদের ই-মেইল, ফেসবুক আইডি এবং ব্যবহৃত মোবাইল গাবতলী এলাকায় ধ্বংস করে। পরে তারা নৌকায় চড়ে নদী পার হয়ে আমিন বাজার এলাকায় পৌঁছালে হাফসার দুজন লোক একটি কালো রঙের নোয়া কারে করে অজ্ঞাত নামা একটি জায়গায় নামিয়ে দিয়ে সিএনজি যোগে তাদের কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে রেল যোগে চট্টগ্রামে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।

তারা আরও জানায়, তিন বান্ধবী তাদের কথামত কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে চট্টগ্রামগামী কোনো রেল না পাওয়ায় কমলাপুর রেলস্টেশন হতে বাসযোগে কুমিল্লা ময়নামতি যায়। এর মধ্যে তারা নিজেদের পরিচয় গোপনের জন্য পশ্চিমা সংস্কৃতির আদলে নিজেদের চুল কেটে পশ্চিমা বেশ-ভূষা ধারণ করে। কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পৌঁছে তারা কেডস, পোশাক এবং একটি মোবাইল কেনে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেখান থেকে তারা ফের বাসযোগে চট্টগ্রাম সিনেমা প্লেস বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দুইটি মোবাইল কিনে বাসযোগে কক্সবাজারে যায়। তারা আত্মগোপনে থাকার জন্য কোনো সিম কেনেনি। কক্সবাজার পৌঁছে তারা গত ১ অক্টোবর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজার কলাতলিতে একটি হোটেলে অবস্থান করে সিমের পরিবর্তে ওয়াইফাই সংযোগ ব্যবহার করে। ২ অক্টোবর তারা কক্সবাজার বিচ এলাকায় বেড়াতে গেলে হাফসার লোক পরিচয়ে আসিফ এবং শফিক নামের ৩০/৩২ বছরের দুই লোক তাদের কাছে থাকা স্বর্ণালংকার ও কিছু নগদ টাকা নিয়ে নেয়।

এ ঘটনায় তিন ছাত্রী আতঙ্কিত হয়ে হোটেলে অবস্থান নেয়। পরে হোটেলের আশপাশে র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে ৫ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৯ টার দিকে ছদ্মবেশে বাসযোগে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

র‌্যাব জানায়, জনৈক হাফসা নামের নারীর কোনো ফেসবুক, ই-মেইল আইডি ভিকটিমেরা শনাক্ত করতে না পারায় হাফসাকে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। হাফসা নামের নারীকে শনাক্ত, নোয়া কারে থাকা ২ ব্যক্তি এবং কক্সবাজারের বিচ এলাকায় স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়া ২ ব্যক্তিসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত আছে।