২০২১ সালের সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার পাওয়া আবদুলরাজাক গুরনাহ ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ভারত মহাসাগরের তাঞ্জানিয়ার জাঞ্জিবার দ্বীপে বেড়ে ওঠেন। কিন্তু ১৯৬০ এর দশকের শেষের দিকে শরণার্থী হিসেবে ইংল্যান্ডে চলে আসেন। ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে শান্তিপূর্ণভাবে মুক্তির পর জাঞ্জিবার একটি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, যা প্রেসিডেন্ট আবেদ কারুমের শাসনামলে দেশটিকে আরব বংশোদ্ভূত নাগরিকদের নিপীড়ন ও গণহত্যার দিকে পরিচালিত করেছিল। গুরনাহ ভুক্তভোগী নৃগোষ্ঠীর সদস্য এবং স্কুল শেষ করার পর তার পরিবার ও দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। তার দেশ ততদিনে নবগঠিত তানজানিয়া প্রজাতন্ত্র।
দেশ ছাড়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র আঠারো বছর। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাঞ্জিবারে ফিরে যেতে পারেননি। বাবার মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তাকে দেখা করতে দেওয়া হয়।
গুরনাহ সম্প্রতি অবসরের আগ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ক্যান্টারবারির কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি এবং উত্তর ঔপনিবেশিক সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। মূলত ওলে সোয়েঙ্কা, এনগো ওয়া থিওংগো এবং সালমান রুশদির মতো লেখকদের তিনি তার আদর্শ হিসেবে নিয়েছিলেন।
গুরনাহ দশটি উপন্যাস এবং বেশ কয়েকটি ছোট গল্প প্রকাশ করেছেন। শরণার্থীদের জীবন-যাপন ছিল তার পুরো কাজের বিষয়বস্তু। তিনি ইংরেজ দেশে যাওয়ার পর ২১ বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করেন এবং যদিও সোয়াহিলি তার নিজ ভাষা ছিল, ইংরেজি ভাষাতেই তিনি তার সাহিত্য রচনা করেন।
তিনি বলেন যে, জাঞ্জিবারে, সোয়াহিলিতে সাহিত্যে তার কাজ কার্যত শূন্য ছিল এবং তার প্রথম দিকের লেখালেখিকে ঠিক সাহিত্য হিসাবে গণ্য করা যায় না। আরবি ও ফার্সি কবিতা, বিশেষ করে ‘দ্য আরবিয়ান নাইটস’, তার সাহিত্যের জন্য একটি প্রাথমিক ও উল্লেখযোগ্য উৎস ছিল, যেমন ছিল কুরআনের সূরা। কিন্তু ইংরেজি ভাষার ঐতিহ্য, শেক্সপিয়ার থেকে ভি. এস. নাইপল, বিশেষভাবে তার কাজের ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে তিনি সচেতনভাবেই ইংরেজি সাহিত্যের প্রচলিত রীতি ভেঙেছেন। ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তুলে ধরার বদলে তিনি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন। তার ২০০৫ সালের উপন্যাস ‘ডেজারশন’ (Desertion), যাকে তিনি ‘ইম্পেরিয়াল রোমান্স’ বা ‘রাজকীয় প্রেম-ভালোবাসা’ বলে অভিহিত করেছেন, তাতে এক প্রচলিত ইউরোপীয় নায়ক বিদেশে রোমান্স থেকে পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন, এরপর গল্পটি তার অনিবার্য, দুঃখজনক সমাপ্তিতে পৌঁছায়। গুরনাহর গল্প আফ্রিকার মাটিতে শুরু হয় এবং বাস্তবে কখনই শেষ হয় না।
গুরনাহর গল্প তার নির্বাসনের সময় থেকে শুরু হয়, কিন্তু তিনি যে স্থানটি ছেড়ে এসেছিলেন তার সঙ্গেই তার সম্পর্ক রয়ে যায়। যার অর্থ হল যে, তার কাজের উৎসের জন্য স্মৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘মেমোরি অফ ডিপারচার’ এর বিষয় হল একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান এবং তার গল্প আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই উপন্যাসের প্রতিভাধর তরুণ নায়ক নাইরোবিতে একজন ধনী চাচার আশ্রয়ে যাওয়ার আশায় উপকূলের দমবন্ধকর সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু চাচার কাছে গিয়ে তিনি অপমানিত হন এবং তার ভাঙ্গা পরিবারে ফিরে যান। যেখানে ছিল তার মদ্যপ ও হিংস্র বাবা এবং পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য হওয়া এক বোন।
গুরনাহর সাবধানে নির্মিত বিবরণগুলোতে একটি কষ্টার্জিত অন্তর্দৃষ্টির ছাপ দেখা যায়। যার একটি ভালো উদাহরণ হলো ১৯৯০ সালে প্রকাশিত তার তৃতীয় উপন্যাস ‘ডটি’ (Dottie)। এতে তিনি অভিবাসী পটভূমির একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর জীবনের চিত্র একেছেন, যিনি ১৯৫০ এর দশকের বর্ণবাদী ঘৃণাপূর্ণ ইংল্যান্ডের কঠোর অবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন এবং তার মায়ের নীরবতার কারণে তার নিজের পরিবারের ইতিহাস জানা নেই। একই সময়ে, তিনি ইংল্যান্ডে শিকড়হীন বোধ করেন, যে দেশে তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। উপন্যাসের এই মূল চরিত্র বই এবং গল্পের মাধ্যমে তার নিজস্ব স্থান এবং পরিচয় তৈরির চেষ্টা করেন; বই পড়া তাকে নিজেকে পুনর্গঠনের সুযোগ করে দেয়। নাম এবং নাম পরিবর্তন এই উপন্যাসে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে যা গুরনাহর গভীর সহানুভূতি এবং মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতা দেখায়, যেখানে কোনো সস্তা ভাবপ্রবণতা নেই।
শরণার্থীর অভিজ্ঞতা বর্ণনায় গুরনাহর ফোকাস ছিল আত্মপরিচয় এবং স্ব-ইমেজের ওপর, যা তার ‘অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স’ (১৯৯৬) এবং ‘বাই দ্য সি’ (২০০১) এর মধ্যে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। লেখকের নিজের মুখে বর্ণিত এই দুই উপন্যাসে নীরবতাকে বর্ণবাদ এবং জাতিবিদ্বেষ থেকে তার পরিচয় রক্ষায় শরণার্থীর কৌশল, তবে, অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে সংঘর্ষ এড়ানোর একটি উপায় হিসেবে হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যা থেকে হতাশা এবং বিপর্যয়মূলক আত্ম-প্রতারণা সৃষ্টি হয়।
সত্যের প্রতি গুরনাহর নিবেদন এবং সরলীকরণের প্রতি তার অরুচি বেশ আকর্ষণীয়। এটি তাকে অস্পষ্ট এবং আপোষহীন করে তুলতে পারে, একই সঙ্গে তিনি তার গল্পের ব্যক্তিদের ভাগ্য অনুসরণ করেন অত্যন্ত সহানুভূতি এবং অসীম প্রতিশ্রুতি নিয়ে।
তার উপন্যাসগুলো ইংরেজি সাহিত্যের গতানুগতিক ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিগত বিবরণ থেকে ফিরে আসে এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের অনেকের কাছে অপরিচিত এবং সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় পূর্ব আফ্রিকার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গুরনাহর সাহিত্য মহাবিশ্বে সবকিছু বদলে যায়- স্মৃতি, নাম, পরিচয়। এর কারণ সম্ভবত তার প্রকল্প কোনও নির্দিষ্ট অর্থে সমাপ্তিতে পৌঁছাতে পারে না। বুদ্ধিবৃত্তিক আবেগতাড়িত এক অবিরাম অন্বেষণ তার সব বইয়ে উপস্থিত রয়েছে এবং এখন ‘আফটারলাইভস’ (২০২০)-এও তা সমানভাবে রয়েছে, যেমনটি ছিল তিনি তার ২১ বছর বয়সী শরণার্থী হিসাবে লিখতে শুরু করার সময় থেকে।
সূত্র: নোবেল প্রাইজের ফেসবুক পেজ থেকে