টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে মা ও তিন মেয়েকে গভীর রাতে ঘরের ভেতর আগুনে পুড়িয়ে হত্যার সাত বছর পার হলেও বিচার কাজ শুরু হয়নি। এতে হতাশা প্রকাশ করেছেন স্ত্রী ও সন্তান হারানো মজিবর রহমান, তার মা জবা বেগম ও মামলার বাদী মোফাজ্জল হোসেন।
আদালত সূত্র জানা গেছে, টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আগে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে একজন আসামি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেন। উচ্চ আদালত এই পিটিশনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিচার কাজ স্থগিত করেন। ফলে থেমে আছে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার বিচার।
মামলার বিবরণে জানা যায়, মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নের সোহাগপাড়া গ্রামের প্রবাসী মজিবর রহমানের স্ত্রী হাসনা বেগম তার তিন মেয়ে নিয়ে বাড়িতে বসবাস করতেন। ওই সময় বড় মেয়ে মনিরা আক্তার মির্জাপুরের গোড়াই উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। একই গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম মনিরা আক্তারকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে পরিবারের পক্ষ থেকে তার প্রত্যাখ্যান করা হয়। এতে জাহাঙ্গীর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এর জের ধরে ২০১৪ সালের ৬ অক্টোবর জাহাঙ্গীর তার সঙ্গীদের নিয়ে রাত আড়াইটার দিকে হাসনা বেগমের বসতঘরের দরজায় বাইরে থেকে আটকে দেয়। দরজার নিচ এবং জানালা দিয়ে পেট্রল ঢেলে দেয়। পরে ঘরের ভেতর আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে আগুনে পুড়ে ঘরের ভেতরেই মর্মান্তিকভাবে মারা যান হাসনা বেগম (৩৮), তার তিন মেয়ে মনিরা আক্তার (১৪), বাক্প্রতিবন্ধী মীম আক্তার (১১) ও নার্সারির শিক্ষার্থী মলি আক্তার (৭)।
পরদিন হাসনা বেগমের ভাই মোফাজ্জল হোসেন বাদী হয়ে জাহাঙ্গীর আলমসহ ১০ জনকে আসামি করে মির্জাপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। ঘটনার কিছুদিন পর জাহাঙ্গীর আলম ও নুর মোহাম্মদ নামে দুই আসামি গ্রেপ্তার হন। দুজনই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। মামলাটি প্রথমে মির্জাপুর থানা এবং পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করে। তদন্ত শেষে সিআইডির উপপরিদর্শক মো. সোহরাব উদ্দিন নয় আসামির বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
আসামিরা হলেন জাহাঙ্গীর আলম, নুর মোহাম্মদ, ইসমাইল হোসেন, মোহাম্মদ আবদুস সামাদ, আবুল বাশার, আবদুল মান্নান, মীর আসাদুল, ওয়াসিম মিয়া ও হারুন অর রশিদ।
২০১৬ সালের ২ মে মামলাটি বিচারের জন্য টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আসে। পরে ওই বছর ১৬ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। আসামিদের বিরুদ্ধে ঘরে ঢুকে আগুনে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা এবং সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।
এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি মনিরুল ইসলাম খান জানান, অভিযোগ গঠনের পর মামলার আসামি হারুন অর রশিদ অভিযোগ থেকে অব্যাহতির জন্য হাইকোর্টে একটি রিভিশন মামলা করেন। উচ্চ আদালত মামলার রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম স্থগিত করার আদেশ দেন। এ জন্য মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি জানান, অভিযোগ গঠনের পর ২০১৬ সালের ১৯ জুলাই সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য ছিল। সেদিন রাষ্ট্রপক্ষ মামলার বাদীসহ তিন সাক্ষী হাজির করেছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতের আদেশ থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়নি। মামলার প্রধান আসামি জাহাঙ্গীর আলম এখনো টাঙ্গাইল জেলহাজতে এবং অন্য আসামিরা জামিনে রয়েছেন।
মামলার সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন হাসনা বেগমের পরিবারসহ মানবাধিকারকর্মীরা।
হাসনা বেগমের স্বামী মজিবর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘সাত বছর আগে আমার স্ত্রী ও তিন মেয়েকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের বিচার শুরু হইল না। এই হত্যার বিচার তাড়াতাড়ি শুরু করা হোক এইটা আমার দাবি’।
মামলার বাদী মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘বোন-ভাগনিকে হারিয়েছি সাত বছর আগে। তাদের হত্যার বিচার এখনো পাইলাম না। এখনো বিচারের অপেক্ষায় দিন কাটায়তেছি’।
টাঙ্গাইলের মানবাধিকারকর্মী মাহমুদা শেলী জানান, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সব জটিলতা নিরসন করে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। এভাবে বিচার কাজ বিলম্বিত হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হবে।