যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্বের মাঝে নিজেদের নেতা খুঁজছেন ইরাকিরা

দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রণাঙ্গন ইরাকে আজ রবিবার পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে। দেশটিতে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এবার ভোটের বাক্সেও মুখোমুখি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের স্বার্থের মাঝে চাপা পড়ে নিজেদের নেতা খুঁজছেন ইরাকিরা। আবার নির্বাচন বয়কটের ডাকও দিয়েছেন অনেকে।

রবিবারের এ ভোটকে দেশটিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। অনেক ইরাকিই বলছেন, ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনীর আগ্রাসনের হাত ধরে যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এসেছে তার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন তারা।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সুবিধা দিতে করা নতুন একটি আইনের আওতায় নির্ধারিত সময়ের কয়েক মাস আগেই এবারের সাধারণ নির্বাচনটি হচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। দুই বছর আগে সরকারবিরোধী বড় গণআন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় এ আইনটি করা হয়।

২০১৯ সালের ওই আন্দোলন দেশটির যে অভিজাত শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হয়েছিল, এবারের নির্বাচনেও তারাই সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবারের ভোটের ফল ইরাক বা মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন আনবে না বলে মনে করছেন ইরাকি কর্মকর্তা, বিদেশি কূটনীতক ও বিশ্লেষকরাও; তবে তারপরও আশাবাদী অনেক ইরাকি। ২০০৩ সালের পর দেশটিতে হতে যাওয়া পঞ্চম সংসদীয় ভোট নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহও দেখা গেছে।

ইতিহাস-সমৃদ্ধ ইরাকে ‘মানব বিধ্বংসী’ বোমা থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালায়। সেসময় দেশটিতে সাদ্দামের শাসন উৎখাত করে দেওয়া হয় ‘গণতন্ত্র’। গত প্রায় ২ দশক ইরাকে গণতন্ত্র হেঁটেছে কাঁটা-বিছানো পথে। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ও ক্ষমতাসীনদের দাপটে দেশটির চলমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি নাখোশ সাধারণ জনগণ।

গত ২ বছর ধরে ইরাকে সরকারবিরোধী গণআন্দোলন চলছে। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে ইরানের মদদপ্রাপ্ত সুসংগঠিত সশস্ত্র মিলিশিয়া ও সুপ্রতিষ্ঠিত ইসলামপন্থি শিয়া দলগুলো জয়ী হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, পার্লামেন্টের ৩২৯ আসনের জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩ হাজার ২০০ এর বেশি প্রার্থী। এতে অংশ নিচ্ছে অন্তত ১৬৭টি রাজনৈতিক দল।

ইরাকের নির্বাচন বিশ্ববাসীর জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছরের সংঘাতে বিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্নীতির বিস্তার, করোনার থাবা- সব মিলিয়ে ইরাকের রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম। সেখানকার শক্তিশালী সশস্ত্র দলগুলো প্রতিনিয়ত সরকারের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলছে। আইএসবিরোধী যুদ্ধের কারণে এখনো হাজারো ইরাকি গৃহহীন।

এমন পরিস্থিতিতে যখন সাধারণ ইরাকিদের দৈনন্দিন জীবনযাপনই মুখ্য তখন এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে ইরাকের পররাষ্ট্রনীতি। সেই নীতির প্রভাব পড়বে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। আর মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বড় ঘটনার প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারিত হবে।

গত ২ বছর ধরে চলা গণবিক্ষোভের মুখে ইরাকে নির্বাচন হচ্ছে নির্ধারিত সময়ের আগেই। এই প্রথম দেশটিতে গণ-আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন হচ্ছে। জনগণের দাবির প্রতি নতি স্বীকার করে পরিবর্তন আনা হয়েছে নির্বাচনী আইনে। আসনগুলো ছোট-ছোট এলাকায় ভাগ করার পাশাপাশি আরও বেশি সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচনে লড়াইয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইরাকের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ বছরের শুরুতে রেজুলেশন গ্রহণ করে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে অন্তত ৬০০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক রয়েছেন। এই প্রথম বায়োমেট্রিক কার্ডের মাধ্যমে ভোট দিচ্ছেন ইরাকের ভোটাররা। এত কিছু পরও ভোট কেনার, ভয় দেখানোর, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

ইরাকে স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর দেশটির শাসন ক্ষমতা সংখ্যালঘু সুন্নিদের হাত থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের হাতে চলে আসে। ইরাকের শিয়া দলগুলোর ওপর ইরানের রয়েছে সীমাহীন প্রভাব। সেই প্রভাবকে কেন্দ্র করে এখন ইরাকের শিয়া সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছেন, ২০১৮ সালে নির্বাচিত প্রভাবশালী শিয়া নেতা মোকতাদা আল সদর এবং অন্যদিকে রয়েছে হাদি আল আমেরির নেতৃত্বাধীন ফাতাহ অ্যালায়েন্স।

ফাতাহ অ্যালায়েন্সে রয়েছে বেশ কয়েকটি ইরানপন্থি শিয়া মিলিশিয়া দল। আবার, ইরানের সঙ্গে আল সদরের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যদিও তিনি প্রকাশ্যে তা অস্বীকার করেন।

আবার এবারই প্রথম ইরানপন্থি খাতাইব হিজবুল্লাহ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

অন্যদিকে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যে তরুণরা অংশ নিয়েছিলেন তারা এখন নির্বাচন নিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত। গত ২ বছরের আন্দোলনে অন্তত ৬০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এতো প্রাণের বিনিময়ে যে নির্বাচন তা বয়কটের ডাক দিয়েছেন সেই তরুণরাই। কেননা, আন্দোলন করার কারণে অনেককে অপহরণ ও হত্যা করা হয়েছে।

তবে সর্বজন শ্রদ্ধেয় গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলি আল সিস্তানি সবাইকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ইরাকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এটিই উত্তম পন্থা।

পশ্চিমাপন্থি হিসেবে পরিচিত  ইরাকের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মুস্তাফা আল খাদিমি চাচ্ছেন ইরাককে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করতে। সে কারণে তিনি সম্প্রতি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে বাগদাদে কয়েক দফা আলোচনার আয়োজন করেন।

ওয়াশিংটন-ভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক রান্দা স্লিম গণমাধ্যমটিকে বলেন, ‘আল খাদিমি আসলে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের স্বার্থের ভারসাম্য টানার চেষ্টা করছেন। তিনি যদি পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন তাহলে তার এসব চেষ্টা বিফলে যাবে’।

ইরাকের ওপর প্রভাব বিস্তারে দুটি পক্ষ সক্রিয়। এক পক্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এবং ইসরায়েল। অন্যপক্ষে ইরান।

২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অভিযান ‍সুন্নি মুসলিম সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া এবং কুর্দিদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। সাদ্দামের আমলে শিয়া ও কুর্দিরা নিষ্পেষিত ছিল।

ক্ষমতার এই পালাবদল দেশটিকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়, যার ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট ইরাকের এক তৃতীয়াংশ দখলে রাখতে পারে।

রোববারের নির্বাচনে শিয়া ধর্মীয় নেতা মোক্তাদা আল-সদরের প্রভাব আরও সুসংহত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরাকে বিদেশিদের প্রভাব বিস্তারের বিরোধিতা করে আসা সদর ইরাকের ইরানপন্থি শিয়া গোষ্ঠীগুলোরও বিরোধী।

তবে শেষ পর্যন্ত এই দুই পক্ষকেই ইরাকের ক্ষমতায় কে বসতে যাচ্ছেন, কারা নতুন প্রধানমন্ত্রী-প্রেসিডেন্ট হবেন, তা নির্ধারণে দরকষাকষিতে বসতে হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।