পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল যন্ত্র পারমাণবিক চুল্লিপাত্র (রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল-আরএনপিপি) স্থাপন করা হয়েছে রোববার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আগামী ২০২৩ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাচ্ছে। এই চুলি স্থাপনের মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়া অনেক দুর এগিয়ে গেল।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৬১ সালে ঈশ্বরদীর রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ আর বেশি দূর এগোয়নি। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রূপপুরে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) সফরের সময় দেশটির তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সহযোগিতায় অনুরোধ করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এ প্রক্রিয়া থেমে যায়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণের উদ্যোগ নেন বাংলাদেশে পরমাণু শক্তি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ডক্টর এম এ ওয়াজেদ মিয়া। এরপর প্রক্রিয়া আগাতে থাকলেও ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর সেই কার্যক্রম আবার হোঁচট খায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পুনরায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রম শুরু করে। পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা হয়। ২০২১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে বাংলাদেশের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এরপর প্রক্রিয়া আরো এগিয়ে যায়।
রূপপুর প্রকল্পের রিঅ্যাক্টরসহ যাবতীয় যন্ত্রপাতি তৈরি হয়েছে রাশিয়াতে। সেখানকার বিভিন্ন কারখানায় এ যন্ত্রগুলো তৈরি করে সমুদ্র পথে বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
প্রথম ইউনিটের ভারী যন্ত্র চারটি স্টমি জেনারেটর, প্রেসারাইজার, হাইড্রো একমোডেটর ও কুন্যান্ড পাম্প ইতিমধ্যেই রূপপুরে এসে পৌঁছেছে। এই ইউনিটের রিঅ্যাক্টর গত বছর অক্টোবরে রাশিয়া থেকে দেশে পৌঁছায় এবং নভেম্বরে সেটি রূপপুরে নেওয়া হয়।
এ বছর আগস্টে ২য় ইউনিটের রিঅ্যাক্টরও এসেছে। এই ভারী যন্ত্রগুলো রাশিয়ার ভলগা নদী থেকে প্রায় ১৪০০০ কিলোমিটার সামুদ্রিক পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের মোংলা বন্দর দিয়ে পদ্মা নদী হয়ে রূপপুরে এসে পৌঁছায়।
স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরের মধ্যে রূপপুর প্রকল্পই দেশের সবচেয়ে বড় এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল প্রকল্প। ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচের এ প্রকল্পে ৯০ ভাগ টাকা ঋণ দিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কয়েকটি চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রুশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এটমস্ট্রয়এক্সর্পোট ।
বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি এটি পরিচালনার জন্য জনবলও দিচ্ছে রাশিয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে আরও ১২০০ মেগাওয়াট অর্থাৎ মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
রোববার সেখানে পারমাণবিক চুল্লিপাত্র স্থাপনের উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৩ সালের মধ্যেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। ইতিমধ্যেই রূপপুর প্রকল্পের জন্য চার স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তাদের শাসনামলে এক ফোঁটা বিদ্যুৎও উৎপাদন করতে পারেনি, তারা শুধু দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের সম্পদ লুট করেছে।
তিনি বলেন, আমরা ক্ষমতায় এসে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে স্বয়ংসম্পন্ন হয়েছি।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে পারমাণবিক চুল্লি বা নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল বসানো কার্যক্রম অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বেলা সাড়ে ১১টায় যুক্ত হয়ে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বিদ্যুৎ দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আরো একটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পদ্মার ওপারে ইতিমধ্যেই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট করার জন্য জমি সার্ভের কাজ চলছে। যদি দক্ষিণাঞ্চলে আরেকটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট করতে পারি তবে দেশে কোনো বিদ্যুতের ঘাটতি থাকবে না’।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পরমাণু বিশ্বে প্রবেশ করেছে এবং আমরা পরমাণু শক্তিকে শান্তির জন্য ব্যবহার করছি। আমরা পারমাণবিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নকে আরো এগিয়ে নিতে চাই, সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি’।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসান।
এ ছাড়া এটমস্ট্রয়এক্সর্পোট গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লকসিন, রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক ড. শৌকত আকবর, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্ব) অধ্যাপক ডা. মো. সানোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল বাতেন, পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুজ্জামান বিশ্বাস, সংসদ সদস্য শামসুল হক টুকু, গোলাম ফারুক প্রিন্স, পাবনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল, ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নায়েব আলী বিশ্বাস, ঈশ্বরদী পৌরসভার মেয়র ইছাহক আলি মালিথাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
রিঅ্যাক্টর ভবনের ভেতর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক ও পরমাণুবিজ্ঞানী ড. মো. শৌকত আকবর, রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল স্থাপনের অনুমতি চান। প্রধানমন্ত্রী অনুমতি দিলে রিঅ্যাক্টর ভেসেলটি নকশা অনুযায়ী যথাস্থানে বসানো হয়। ৫ থেকে ৬ মিনিটের মধ্যে এটি বসানো শেষ হলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রিঅ্যাক্টর ভবন থেকে অনুষ্ঠানস্থল।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল যন্ত্রটি স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়। রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় নির্মিত হচ্ছে রূপপুর প্রকল্প।
এ প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে যে রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হলো সেটি রাশিয়ার তৈরি সর্বশেষ প্রযুক্তি থ্রিজি প্লাস প্রজন্মের ভিভিইআর ১২০০ মডেলের।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের যে যন্ত্রে নিউক্লিয়ার ফুয়েল (পারমাণবিক জ্বালানি) ইউরেনিয়াম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তার মূল কাঠামো হচ্ছে এই বিশেষ যন্ত্র অর্থাৎ রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল (পরমাণু চুল্লি)। এই রিঅ্যাক্টরকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের হার্ট বা হৃৎপিণ্ড বলা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পারমাণবিক প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক অ্যানার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (আইএইএ) গাইড লাইন অনুযায়ী এবং সংস্থাটির কড়া নজরদারির মধ্য দিয়েই রূপপুর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে।