ভূ-রাজনীতিতে চড়ছে দাম

শীত এখনো পুরোপুরি আসেনি, কিন্তু তার আগেই বাড়তে শুরু করেছে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম। বিশেষত ইউরোপে গ্যাসের দাম বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত বছর ইউরোপে গ্যাসের যে দাম ছিল, এখন সেই দাম অন্তত ছয়গুণ বেশি। গত বুধবার নেদারল্যান্ডসেই গ্যাসের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ। অন্য দেশগুলোর অবস্থাও কাছাকাছি। এমন অবস্থায় ইউরোপের শীতকালের মিত্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গ্যাস সরবরাহ চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আশ্বাসের পর কয়েকদিন গড়ালেও এখনো পাইপলাইনে রাশিয়ার গ্যাসের দেখা নেই। বিশ্লেষকরা বিশ্বজুড়ে এবার গ্যাসের দামবৃদ্ধির পেছনে ভূ-রাজনীতিকেই দায়ী করেছেন।

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বিশ্বে গত বছর গ্যাসের চাহিদা কমে গিয়েছিল। কারণ তখন সংক্রমণ রোধে অধিকাংশ দেশেই লকডাউন পরিস্থিতি চলছিল। ফলে বন্ধ ছিল শিল্পকারখানা। কিন্তু মহামারী কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর, বিশেষ করে এশিয়ায় বেড়েছে গ্যাসের চাহিদা। কারণ এশিয়ার উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপের পণ্যের চাহিদা মেটাতে ব্যাপক উৎপাদনে যেতে চাইছে, এজন্য তাদের চাই গ্যাস। কিন্তু চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বেড়ে গেছে গ্যাসের দাম।

গ্যাসের দাম এতটাই বেড়েছে যে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদক দেশ যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি মিলিয়ন থার্মাল ইউনিটের দাম যেখানে ছিল এক দশমিক সাত ডলার, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় দশমিক ৩ ডলারে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাসের প্রতি মুখাপেক্ষী রাষ্ট্রগুলোকে তাই পড়তে হয়েছে ব্যাপক সমস্যার মধ্যে। ইউরোপকে পাশে রাখতে বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের গ্যাস সরবরাহ করে আসছে। কিন্তু এবার গ্যাসের দামবৃদ্ধির কারণে ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় রাশিয়া যদি তুলনামূলক কম মূল্যে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করে, তাহলে ভূ-রাজনীতিতে ইউরোপে পুতিনের জয় হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ইউরোপ পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে যেতে চাইছে। ওই অঞ্চলের অনেক দেশই এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা থেকে গ্যাসে রূপান্তরিত হতে চাইছে। ফলে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে আগের তুলনায়। উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে ইউরোপের নিজের গ্যাস উৎপাদন প্রায় তলানিতে পৌঁছেছে। অনেক দেশই তাদের গ্যাসক্ষেত্রগুলো বন্ধ করে দিয়েছে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে। ২০০৫ সালে ইউরোপের বাৎসরিক গ্যাস উৎপাদন ছিল ৩০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। চলতি বছরে তা ১০৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন কিউবিক মিটারে এসে ঠেকেছে। এই উৎপাদন কমতে থাকায় ইউরোপের রাশিয়ার প্রতি নির্ভরতা বাড়ছে।

রাশিয়ার গ্যাস ইউরোপে যায় ইউক্রেন এবং পোল্যান্ড হয়ে। এই দুই দেশের মধ্য দিয়ে গ্যাস যাওয়ায় রাজনৈতিকভাবে কিছুটা ঝামেলায় পড়েছে ইউরোপ ও রাশিয়া। তাই পুতিনের নির্দেশে ইউক্রেন ও পোল্যান্ডকে বাইপাস করে নর্ড স্ট্রিম ২ নামে একটি পাইপলাইন করা হচ্ছে যা রাশিয়ার ভূখণ্ড থেকে সরাসরি জার্মানি যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি এই নর্ড স্ট্রিম ২-কে স্বীকৃতি দেয়, তবেই রাশিয়া গ্যাস ছাড়তে শুরু করবে। অতীতে ইউরোপে যখন গ্যাস সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তখন সহায়তা করেছিল রাশিয়া। কিন্তু এবার রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান গ্যাসপ্রম ইউরোপের চাহিদার তুলনায় মাত্র ৩৫ শতাংশ গ্যাস দিয়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় এবার রাশিয়া ইউরোপে কম গ্যাস রপ্তানি করেছে। ইউরোপ নর্ড স্ট্রিমকে অনুমোদন না দিলে পুতিন গ্যাস দেবেন না। আর এই নতুন বিকল্প পাইপলাইন প্রশ্নে নেতিবাচক অবস্থানে ইউরোপের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র।