শিক্ষার্থীদেরকে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর কার্টুন দেখানোর জন্য নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার ফ্রান্সের স্যামুয়েল প্যাটি (৪৭) নামের সেই হাইস্কুল শিক্ষককে জাতীয় ‘বীর’ ঘোষণা করা হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইম্মানুয়েল ম্যাখোঁ তাকে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের একজন ‘কোয়াইট হিরো’ বা ‘শান্ত বীর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আগামী শনিবার তার স্মরণে একাধিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে।
২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর ৪৭ বছর বয়সী স্যামুয়েল প্যাটিকে শিরোশ্ছেদ করে হত্যা করে আবদুল্লাখ আনজোরভ নামের ১৮ বছর বয়সী এক চেচেন শরণার্থী। চেচনিয়া থেকে আসা শরণার্থী আবদুল্লাহ আনজোরভ কয়েক বছর ধরে ফ্রান্সে বসবাস করছিলেন।
স্যামুয়েল প্যাটি প্যারিসের শহরতলীর কনফ্লান্স-সাঁইত-অনারিন (Conflans-Sainte-Honorine) এলাকায় একটি মিডল স্কুলে ইতিহাস ও ভূগোলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি তার ক্লাসে বাকস্বাধীনতার পাঠ দেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদেরকে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর ব্যাঙ্গাত্মক কিছু কার্টুন দেখান। আর তার প্রতিশোধ নিতেই আব্দুল্লাহ তাকে গলা কেটে হত্যা করেন।
ফরাসি প্রজাতন্ত্রের ‘শান্ত নায়ক’ খেতাবপ্রাপ্ত জনপ্রিয় এই শিক্ষকের স্মরণে আগামী শনিবার বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
কনফ্লানসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একটি খোলা বইয়ের স্মারক উন্মোচন করা হবে। আর প্যারিসের মর্যাদাপূর্ণ সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে একটি চত্বরের নামকরণও করা হবে তার নামে।
প্যাটির নৃশংস হত্যাকাণ্ড ফ্রান্স জুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছিল। এই হত্যাকাণ্ডকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফ্রান্সের স্কুল শিক্ষার্থীদেরকে যেসব মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়া হয়ে আসছিল তার ওপর আক্রমণ হিসাবে দেখা হয়। এসব মূল্যবোধের মধ্যে রয়েছে, গির্জা ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ এবং ধর্ম নিয়ে নিন্দা করার অধিকার।
সমাজবিজ্ঞানী মিশেল উইভিয়োরকার বলেন, এটি ফরাসিদের দীর্ঘদিনের লালিত এই ধারণার উপর আক্রমণ ছিল যে, ‘শিশুরা স্কুলে ঢোকার সময় তাদের ধর্মীয় পার্থক্য দরজার বাইরে রেখে আসে’।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষেই ‘আধুনিকতা, অগ্রগতি, সভ্যতা এবং জ্ঞানের’ পথে যাত্রা করবে বলে আশা করা হয়।
২০১৫ সালে চার্লি হেবদোর কার্টুনিস্টদের ওপর হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছিল তেমনি এই শিক্ষক নিহত হওয়ার পরও হাজার হাজার মানুষ বাকস্বাধীনতা রক্ষায় ফ্রান্স জুড়ে মিছিল করেছিল। এই শিক্ষক চার্লি হেবদোর কার্টুনিস্টদের আঁকা ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুনই তার শ্রেণীকক্ষে দেখিয়েছিলেন।
কমপক্ষে তিনটি শহরে প্যাটির নামে স্কুলের নামকরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ভ্যালেন্টনের বহু-জাতিক পূর্ব প্যারিস শহরতলী।
প্রতিবাদ দেখানো সত্ত্বেও, কিছু শিক্ষক বলছেন যে, প্যাটির হত্যার কারণে তারা এক ধরণের সেলফ-সেন্সরশিপ বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ কৌশল অবলম্বন করছেন। অন্য ধর্মের ব্যাপারে তারা এখন অনেক সাবধানে কথা বলেন।
কনফ্লান্স-সাঁইত-অনারিনের কাছের একটি শহরের একজন শিক্ষক এএফপিকে বলেন, তিনি এখন তার ক্লাসে ধর্ম নিয়ে আলোচনা করার সময় ‘আরও সাবধান থাকেন’।
লিবারেশন পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে, প্যাটির এক সহকর্মীও বলেন যে, তিনিও অনেক বেশি সতর্ক থাকেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী শিক্ষক বলেন, ‘আমি এখন যা বলি তার প্রতিটি কথার ওজন করি’।
তিনি বলেন যে, তিনি আশঙ্কায় থাকেন, তার মন্তব্য ‘শিক্ষার্থীরা ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে এবং ব্যাপকভাবে (স্কুলের বাইরে) শেয়ার করতে পারে, যেমনটি স্যামুয়েল প্যাটির বেলায় ঘটেছিল’।
প্যাটি তার ১৪-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদেরকে মহানবী মোহাম্মদের (সা.) দুটি কার্টুন দেখান। যার একটিতে মহানবীর চারটি নগ্ন ছবি ছিল। এরপর এক মুসলিম ছাত্রের পিতা অনলাইনে এর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন। যিনি দাবি করেছিলেন যে, প্যাটি মুসলমানদেরকে তার ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন।
ওই প্রচারাভিযান নরম্যান্ডি-ভিত্তিক চরমপন্থী আনজোরভের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যে প্যাটিকে তার স্কুলে গিয়ে খুঁজে বের করেছিল এবং তার কিছু ছাত্রকে তাদের ওই শিক্ষক স্কুল থেকে বাড়ি যাওয়ার সময় তাকে জানানোর জন্য টাকা দিয়েছিল।
আনজারভ নিজেও সেদিন পরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
ম্যাখোঁর অভিবাসী সম্প্রদায়ের ‘ইসলামপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদ’ নামক প্রচারণা নিয়ে প্রচণ্ড বিতর্কের মধ্যে এই হামলা হয়েছিল। ওই প্রচারনায় রক্ষণশীল মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতা, বাকস্বাধীনতা এবং স্কুলে শেখানো অন্যান্য মূল্যবোধ প্রত্যাখ্যান করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ওই হামলার সময় ম্যাখোঁ ফ্রান্সের অভিবাসীদের মধ্যে ‘ইসলামপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদ’ এর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিতর্কিত একটি প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। ম্যাখোঁ রক্ষণশীল মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতা, বাকস্বাধীনতা এবং স্কুলে শেখানো অন্যান্য মূল্যবোধ প্রত্যাখ্যান করার অভিযোগ করেন।
তবে বামপন্থীরা ম্যাখোঁর বিরুদ্ধে ইউরোপের সবচেয়ে বড় মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ দেখানোর অভিযোগ করেছেন।