অস্তিত্বের লড়াইয়ের ম্যাচে নায়ক হতে পারতেন বাংলাদেশ অথবা নেপালের কোনো খেলোয়াড়। কিন্তু ম্যাচ শেষে ‘নেপালের নায়ক’ বনে গেলেন উজবেকিস্তানের রেফারি আখরোল রিসকুলায়েভ। শুরু থেকেই নেপালের পক্ষে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার বিতর্কিত বাঁশিতেই বাংলাদেশের স্বপ্ন ভেঙে চুর। ৯ মিনিটে সুমন রেজার হেডে লিড নেয় বাংলাদেশ। সেই লিড তারা ধরে রাখে প্রায় ৮০ মিনিট। এরপরেই আসে সেই হতাশার মুহূর্ত। ম্যাচে ফিরতে মরিয়া নেপালের অঞ্জন বিস্তা গোলমুখের জটলায় অসাধারণ এক ডাইভে বিভ্রান্ত করে দেন প্রায় ৩০ গজ দূরে থাকা রেফারিকে। পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়ে দেন। বিস্ময়করভাবে বিশ্বনাথ ঘোষকে দেখানো হয় হলুদ কার্ড। সেই অঞ্জনই লক্ষ্যভেদ করে নেপালকে কাক্সিক্ষত ১ পয়েন্ট এনে দেন। বাংলাদেশকে নিতে হয় বিষাদময় বিদায়। ঠিক মাসখানেক আগে রেফারির এ রকমই এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বলি হতে হয়েছিল বসুন্ধরা কিংসকে। সেবারের মতো এবারও ঘটনাটা এই মালের রাশমি ধান্দু স্টেডিয়ামে। কিংসের মতো বাংলাদেশের ডাগআউটেও একই ব্যক্তিÑ অস্কার ব্রুজন। দ্বিতীয়বারের মতো রেফারির অন্যায়ের শিকার হওয়ার পর আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি কোচ। নিষেধাজ্ঞার ভয়ে হয়তো অনেক কথাই চেপে গেছেন। শুধু বলেছেন, পেনাল্টির সিদ্ধান্তটা রেফারির নিকৃষ্টতম সিদ্ধান্তের একটি।
‘আমি আগেই বলেছি, হয়তো আমরা এই আসরের সেরা দল নই। তবে সেরাদের মধ্যে একটি। মাঠে আজ যা ঘটেছে সেটা সত্যি অপ্রত্যাশিত। আমাদের ড্রেসিং রুমের অবস্থা আসলে উল্লেখ করার মতো নয়। সব কিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। নেপালের একজন খেলোয়াড় ডাইভ দিয়ে রেফারির কাছ থেকে পেনাল্টি উপহার পেয়েছে। অথচ রেফারি নিজে ছিলেন প্রায় ৩০ গজ দূরে। আমরা ভেবেছিলাম তিনি ফাউলের বাঁশি বাজাবেন। কিন্তু হয় উল্টো। ম্যাচের পর্যবেক্ষণ জানতে চাইলে বলব রেফারিই চাননি বাংলাদেশ ফাইনালে খেলুক’ ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন অস্কার ব্রুজন। তিনি যোগ করেন, ‘একই রকম একটা সিদ্ধান্তে আমাদের ভুগতে হয়েছিল এএফসি কাপেও। এই মাঠেই আরেকবার একই রকম ভুল সিদ্ধান্তে বলি হতে হলো। তারপরও বলব বাংলাদেশ অসাধারণ একটা টুর্নামেন্ট খেলেছে। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের পর বলেছিলাম বাংলাদেশের ফুটবল জেগে উঠেছে। আমি একই কথার পুনরাবৃত্তি করছি। মিডিয়া দেখেছে আমাদের সঙ্গে কী হয়েছে।’
শেষ মুহূর্তে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে রেফারির ওপর চড়াও হয়েছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। সেই ক্ষোভ পরবর্তীতে পরিণত হয় হতাশায় ভেঙে পড়ায়। ব্রুজন অবশ্য চেয়েছিলেন নেপালকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেরার সুযোগ না দিতে, ‘বিরতির পরও ছেলেদের আক্রমণাত্মক থাকতে বলেছি। আরেকটি গোল করে আমরা চেয়েছিলাম নেপালকে শেষ করে দিতে। ডিফেন্স নিñিদ্র রেখে দ্রুত কাউন্টারে গিয়ে আক্রমণ গড়েছে ছেলেরা। এটাই খেলতে চেয়েছি। কিন্তু মাঠে প্রতারণা করে নেপাল পেনাল্টি আদায় করেছে।’ পেনাল্টির হঠকারী সিদ্ধান্তের ৮ মিনিট আগে রেফারি বাংলাদেশ কিপার জিকোকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে করেন প্রথম ভুল। বিপদ বুঝতে পেরে রাকিব হোসেনের একটা ব্যাক পাস বক্সের বাইরে এসে ক্লিয়ার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার শট হাতে লাগলে রেফারি তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ব্রুজন বলেন, ‘পেনাল্টির সিদ্ধান্ত শুধু নয়, জিকোর লাল কার্ডটাও বিতর্কিত। কারণ সে ইচ্ছে করে বলটা হাতে লাগায়নি। প্রথমে সে পা দিয়ে শট করেছে। অনিচ্ছা সত্যেও বল হাতে লাগে। এটা কোনোভাবেই লাল কার্ড হয় না।’
নেপালের কুয়েতি কোচ আব্দুল্লাহ আল মুতাইরিও পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিষ্কার কোনো দাবি জানাননি, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে ওটা পেনাল্টি। তবে আমি নিশ্চিত নই। প্রতিপক্ষ হিসেবে ওটা আমাদের কাছে সঠিক হলেও হয়তো বাংলাদেশিদের কাছে ভুল। তবে আমি বলব ভাগ্যটা কখনো কখনো বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। এই ম্যাচে সেটাই হয়েছে। আমি বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানাই অসাধারণ একটা ম্যাচ খেলার জন্য।’
দলের অন্যতম পারফরমার রাকিব হোসেন ধরা গলায় বললেন, ‘রেফারির সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি অন্যায্য ছিল। যে কারণে বেশি খারাপ লাগছে। ড্রেসিং রুমে সবাই খুব কান্নাকাটি করছে। এভাবে বিদায় নিতে হবে আমরা কল্পনা করিনি।’
১৬ বছর পর আরেকবার সাফের ফাইনালের খুব কাছে গিয়েও হলো না। তাই আবার নতুন করে স্বপ্ন বুনতে হবে লাল-সবুজদের।