রাশিয়া ও চীনের পর হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা চালালো যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সমালোচনার মধ্যেই শব্দের চেয়েও পাঁচ গুণ গতির এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালো যুক্তরাষ্ট্র।
স্থানীয় সময় গত বুধবার দেশটির ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একটি উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে পরীক্ষাটি চালানো হয় দাবি করা হয়। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে এনডিটিভি।
একই দিন চীনের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
মার্কিন নৌ বাহিনীর বানানো এই বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি বাস্তবসম্মত পরিবেশে উন্নত হাইপারসনিক প্রযুক্তি, ক্ষমতা এবং প্রোটোটাইপ সিস্টেম প্রদর্শন করেছে বলেও দাবি করে মার্কিন নৌবাহিনী।
প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো হলেও শব্দের গতির পাঁচগুণেরও বেশি উড়তে পারে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। গত আগস্টে পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় চীন, চলতি সপ্তাহে এমন খবর প্রকাশের পরই উদ্বেগ জানায় যুক্তরাষ্ট্র।
উত্তর কোরিয়ার চালানো একের পর এক ক্রুজ মিসাইল ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষারও নিন্দা জানিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে কিছু না বললেও চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
বৃহস্পতিবার (২১ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে হাইপারসনিক প্রযুক্তির পরীক্ষার বিষয়টি জানিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী জানায়, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে এই পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিশেষ করে নৌবাহিনীর নকশায়। এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বাস্তবিক ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক হাইপারসনিক প্রযুক্তি ও সক্ষমতা কেমন হবে, তা দেখা গেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন জানিয়েছে, আশা করা যাচ্ছে ২০২৫ সালের মধ্যেই হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা সম্ভব হবে।
পৃথিবীর প্রধান সামরিক শক্তিগুলো ইদানিং ঘন ঘন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, এমনকি উত্তর কোরিয়া- এই সবগুলো দেশই গত এক মাসের মধ্যে তাদের ‘হাইপারসনিক’ অর্থাৎ শব্দের চেয়ে কয়েকগুণ দ্রুতগতিসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পৃথিবীর ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে সামরিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতিযোগিতার একটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পর্ব চলছে এখন।
এ মুহূর্তে প্রতিযোগিতাটা হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে। এতদিন ধরে বিভিন্ন দেশের হাতে যেসব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, সেগুলো অনেকটা সেকেলে হয়ে যাচ্ছে এবং তার শূন্যস্থান পূরণ করতেই এ প্রতিযোগিতা - কার আগে কে নতুন প্রজন্মের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে।
তাছাড়া, পরাশক্তিগুলোর হাতে এখন যেসব প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র আছে, এগুলো যেভাবে ঠেকাতে হবে তার কৌশল প্রতিপক্ষ দেশগুলো ইতোমধ্যেই বের করে ফেলেছে । তাই চেষ্টা চলছে এমন এক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির, যা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরক্ষা ব্যূহকে ভেদ করতে পারবে।
ঠিক এ লক্ষ্য নিয়েই তৈরি হচ্ছে হাইপারসনিক মিসাইল- যা এত দ্রুতগতির যে তা উড়ে এসে আঘাত হানার আগে চিহ্নিত করা বা মাঝপথে তাকে ধ্বংস করে দেয়া খুব কঠিন।
শব্দের গতি হচ্ছে প্রতি সেকেণ্ডে ১,১২৫ ফুটের মত। অনেক সামরিক জেট বিমান বা অধুনাবিলুপ্ত কনকর্ডের মত যাত্রীবাহী বিমানও এর চেয়ে বেশি দ্রুত অর্থাৎ ‘সুপারসনিক’ গতিতে উড়তে পারে।
কিন্তু একটা হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুটতে পারে শব্দের চেয়ে পাঁচ থেকে নয় গুণ বেশি গতিতে। এ থেকেই খানিকটা ধারণা পাওয়া যায় যে এই মিসাইল কত দ্রুতগামী এবং কেন এর মোকাবিলা করা কঠিন।
অন্তত আটটি দেশ এখন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
সম্প্রতি লন্ডন থেকে প্রকাশিত অর্থনীতি বিষয়ক প্রভাবশালী সংবাদপত্র ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক রিপোর্ট বিশ্বে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এতে বলা হয়, গত আগস্ট মাসে চীন শব্দের চেয়ে পাঁচগুণ দ্রুতগতিসম্পন্ন- এবং পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম - একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এতে উদ্বেগ প্রকাশ করে। যদিও চীন দাবি করছে যে ওটা ছিল পুনর্ব্যবহারযোগ্য একটি মহাকাশযান - ক্ষেপণাস্ত্র নয়।
চীনের কথায় অবশ্য ওয়াশিংটনের উদ্বেগ কাটেনি। চীন মিসাইল প্রযুক্তিতে আসলে কতটা উন্নতি করে ফেলেছে এবং এর পরিণাম কী হবে- এ নিয়ে পেন্টাগনের প্রধানরা দুর্ভাবনায় পড়ে গেছেন।
এর মাত্র কিছুদিন আগে অক্টোবরের ৪ তারিখে বার্তা সংস্থা এপি খবর দেয় যে রাশিয়া তাদের একটি পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ব্যারেন্টস সী-তে ‘সেভারোদভিনস্ক’ সাবমেরিন থেকে জিরকন নামের দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের এই পরীক্ষা চালানো হয়।
শব্দের চেয়ে নয় গুণ দ্রুতগতিতে উড়ে গিয়ে ১,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এই জিরকন। শুধু এই জিরকনই নয়, আরও কয়েক ধরনের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে রাশিয়া।
এরই মাত্র কয়েকদিন আগে, সেপ্টেম্বর মাসের ২৭ তারিখ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রেথিওন নামে একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে। এটি ছিল শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ দ্রুতগতিসম্পন্ন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ২০১৩ সালের পর এই স্তরের কোন সমরাস্ত্রের সফল পরীক্ষা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রথম চালালো।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া গত কিছু দিনে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেই তারা একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রও পরীক্ষা করেছে, যদিও দক্ষিণ কোরিয়ার সূত্রগুলো বলছে, ওই পরীক্ষা সফল হয়নি।