ক্ষোভের আগুন

ট্রাফিক পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরসাইকেল চালক ইলিয়াস নিজের মোটরসাইকলটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়েছেন। রাজধানীর পলাশী এলাকায় এ ঘটনার পর পুলিশ বলেছে, এই মোটরসাইকেল চালকের আগে চার হাজার টাকা জরিমানার দুটি মামলা ছিল। জরিমানার সে টাকা তিনি পরিশোধ করতে পারেননি। এরই মধ্যে মাথায় হেলমেট না থাকায় বৃহস্পতিবার সার্জেন্ট আরও এক হাজার টাকা জরিমানা করলে কিছু দূর গিয়ে তিনি তার মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এর আগেও গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বাড্ডায় নিজের মোটরবাইক আগুন দিয়ে পুড়িয়েছিলেন চালক শওকত আলম সোহেল। সেই ঘটনায় ঢাকার রাস্তায় রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরসাইকেল চালকরা সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃক হয়রানির বিরুদ্ধে চালকরা সোচ্চার হয়েছিলেন। সড়ক অবরোধ এবং রাইড শেয়ারিং বন্ধ রেখে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছিলেন। ওই ঘটনার পর ট্রাফিক পুলিশের খামখেয়ালিপনা ও উৎকোচ গ্রহণের নানা খবর গণমাধ্যমে উঠে এসেছিল। সেই ঘেটনার রেশ না কাটতেই আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি মোটেও বদলায়নি। 

দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, দুই সন্তানের জনক ইলিয়াস ১৩ বছর দেশের বাইরে ছিলেন। তার স্ত্রী ও সন্তান গ্রামের বাড়িতে থাকে। তার কাপড়ের ব্যবসা ছিল। করোনায় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে দেড় মাস আগে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থেকে তিনি ঢাকায় আসেন। যাত্রাবাড়ী মাতুয়াইল এলাকায় একটি মেসে থেকে রাইড শেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেল চালান। এর আগে মোটরসাইকেলে আগুন লাগানো শওকত আলী সোহেলের কেরানীগঞ্জে স্যানিটারি পণ্যের একটি দোকান ছিল। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গত দুই-তিন মাস ধরে তিনি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন। এই দুটি ঘটনাতেই দেখা যাচ্ছেকরোনাভাইরাসের ভয়াবহতার শিকার হয়ে নতুন পেশায় টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছিলেন তারা। বাধ্য হয়ে বেছে নিয়েছিলেন মোটর রাইড শেয়ারিংয়ের কাজ। সেটি করতে গিয়েই ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের প্রতি রাগে ও জমে থাকা ক্ষোভে নিজেদের আয়ের একমাত্র অবলম্বন আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্যমতে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত সারা দেশের প্রায় এক কোটি লোক কাজ হারিয়েছেন। ২০২০-এর প্রথম দিকে শুরু হওয়া কভিড মহামারীর তাণ্ডবে সারা পৃথিবীতে বড় ধরনের সংকট চলছে। এখনো সেই আঘাতে বিভিন্ন দেশ জর্জরিত। এর আক্রমণ থেকে জীবন বাঁচানোর জন্য যে ধরনের ব্যবস্থা নিতে হয়েছে, তার ফলে জনজীবন হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত এবং মানুষের জীবিকা পড়েছে ঝুঁকির মুখে। জীবন আর জীবিকার এই সংঘর্ষে মানুষ হয়ে পড়ছে নাস্তানাবুদ। বৈশ্বিক অর্থনীতি পড়েছে গভীর মন্দায়। অর্থনৈতিক মন্দার ফলে বিভিন্ন দেশে বেকারত্ব ও কর্মহীনতা বেড়েছে দ্রুত। মহামারীর সময় আমরা দেখেছি দরিদ্র এবং নিম্নবিত্ত মানুষের অসহায় অবস্থা। মহামারী-পরবর্তী অবস্থায় সাধারণ মানুষ যেন আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে যেতে পারে, তার জন্য কী করা যেতে পারেএসব প্রশ্ন নিয়ে যখন দেশে-বিদেশে চলছে গবেষণা এবং আলোচনা তখন নিজের মোটরসাইকেল আগুন দিয়ে পোড়ানোর মধ্য দিয়ে কঠিন বাস্তবতাকেই যেন নির্দেশ করে। 

এ দুটি ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা। প্রথম ঘটনার প্রেক্ষিতে যে প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সে সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিলে পরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানো যেত। এই ঘটনায় রাস্তায় দায়িত্বপালনরত ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠে এসেছে, তা আমলে না নিয়ে প্রত্যাখ্যান করা হলে জনমনে ভুল বার্তা যাবে। এই ঘটনায় যেসব প্রসঙ্গ ও বিষয় উঠে এসেছে, সেগুলোর কোনো সরাসরি ব্যাখ্যা দায়িত্বশীলদের তরফে দেওয়া হয়নি। অথচ নানা প্রসঙ্গ রয়েছে, যা পরিষ্কার করলে প্রতিকার পাওয়া যাবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে। আমরা মনে করি, মোটরসাইকেল চালকদের অভিযোগ আমলে নিয়ে তা খতিয়ে দেখা উচিত। প্রকাশ্য রাস্তায় দিনেদুপুরে এই ঘটনা জনগণ যেহেতু দেখেছে, তাই তাদের কাছে প্রতিটি প্রসঙ্গ পরিষ্কার করা প্রয়োজন। একতরফাভাবে চালকদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করার কৌশল নেওয়ার চেয়ে উত্থাপিত বিষয়গুলোর যৌক্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা তুলে ধরা বেশি জরুরি। পাশাপাশি করোনায় আর্থিকভাবে লোকসানের মুখে পেশা বদলানো ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারের পাশেও দাঁড়াতে হবে তাদের ভরসা হয়ে।