মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের প্রকাশ্যে বিচার হওয়া উচিত: সানাউল হক

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচার দ্রুত ও প্রকাশ্য আদালতে করার দাবি জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক সানাউল হক।

সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক এম সানাউল হক।

২০১৩ সালের আগস্টে জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে তদন্ত শুরু করে তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা। ২০১৪ সালের মার্চে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে জমা দেয় সংস্থাটি। তখন সরকারের তরফে জানানো হয়, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অপরাধ  (ট্রাইব্যুনাল) আইনে সংগঠনের বিচার ও শাস্তির বিধান নেই। পরে ওই বছরই অপরাধী হিসেবে সংগঠনের শাস্তির বিধান রেখে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু পরে এ উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সানাউল হক বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হলে জড়িত সংগঠনের অঙ্গ সংগঠন ও জড়িত ব্যক্তিদেরও বিচার হয়। অপরাধে সংগঠনের নেতৃত্বের দায় তখন চলে আসে। ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ে জামায়াতকে একটি অপরাধী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা খুব দ্রুত জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দিয়েছিলাম। কিন্তু আইনটি আর সংশোধন হয়নি। জামায়াতের বিচারে বাধা কোথায়।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, সংগঠন হিসেবে জামায়াতের ইসলামীর বিচার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বিচার প্রকাশ্য আদালতে হওয়া উচিত বলে মনে করি।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা দুটি মামলায় কুড়িগ্রাম ও সাতক্ষীরার ১৭ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

কুড়িগ্রামের মামলায় আসামি ১৩ জন। তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি অভিযোগ আনা হয়েছে। শিগগির প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হবে।

গেল বছরের মার্চে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর তদন্ত সংস্থার কার্যক্রম থমকে যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ওই বছর ১২ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ৭৮ তম তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে তদন্ত সংস্থা। যাতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাটের পলাতক তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি অভিযোগ আনা হয়। এরপর করোনভাইরাস সংক্রমণ ফের বাড়লে তদন্তকাজ আবারও থমকে যায়। দীর্ঘ ১৪ মাসের বেশি পার হওয়ার পর সোমবার ৭৯ ও ৮০ তম তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের কথা জানালো তদন্ত সংস্থা। ১৭ জনের মধ্যে পাঁচজন এখনো পলাতক। গ্রেপ্তারের স্বার্থে তাদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেনি তদন্ত সংস্থা।

একাত্তরে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ ও দেবহাটা এলাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার চার আসামির মধ্যে তিনজন এখনো পলাতক। কারাগারে থাকা আসামি হলেন কালিগঞ্জের ইন্দ্রনগর গ্রামের মো. আকবর আলী শেখ (৭০)। এ আসামিদের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর তদন্ত শুরু হয়। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন অগ্নিসংযোগের দুটি অভিযোগে চারটি ভলিউমে ১৭৫ পাতার প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানান সংস্থার কর্মকর্তারা। 

সানাউল হক জানান, কুড়িগ্রামের ১৩ আসামির বিরুদ্ধে তিন খণ্ডে ৩৭৫ পাতার প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে দুজন এখনো পলাতক। কারাগারে থাকা আসামিরা হলেন- মো. নুরুল ইসলাম ওরফে নুর ইসলাম (৭১), মো. এছাহাক আলী ওরফে এছাহাক কাজী (৭০), মো. ইসমাইল হোসেন (৭০), মো. ওছমান আলী (৭০), মো. আব্দুর রহমান (৬৫), মো. মো. আব্দুর রহিম ওরফে রহিম মৌলানা (৬৫), মো. শেখ মফিজুল হক (৮১), মো. মকবুল হোসেন ওরফে দেওয়ানী মকবুল (৭২), মো. ছাইয়্যেদুর রহমান মিয়া ওরফে সাইদুর রহমান (৬৪), মো. শাহজাহান আলী (৬৪) ও মো. আব্দুল কাদের (৬৭)। ১১ জনের মধ্যে মকবুল হোসেন জেলার রাজারহাটের এবং বাকিরা উলিপুরের বাসিন্দা। একাত্তরে তাদের প্রায় সবাই মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন। ২০২০ সালের ৯ মার্চ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামিরা একাত্তরে কুড়িগ্রামের উলিপুর ও রাজারহাট থানা এলাকায় হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন। এ সময় ৭৪৫ জনকে হত্যা ও ৭০/ ৭৫ জন নির্যাতনে আহত হন। ধর্ষণের শিকার হন দুই নারী, অগ্নিসংযোগ করা হয় ২৬০ থেকে ২৭০টি বাড়িতে। লুটপাট করা হয় ৮০ থেকে ৯০টি বাড়িতে। মামলায় ঘটনার সাক্ষী করা হয়েছে ১১১ জনকে।