সাক্ষরতা ও শিক্ষায় বৈষম্য

সাক্ষরতা ও শিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্যকে প্রকটতর করেছে এই কভিড মহামারী। ৭৭৩ মিলিয়ন নিরক্ষর জনগণের জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। বহু দেশই কভিড-১৯ মোকাবিলা করার জন্য যেসব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে নিরক্ষরদের জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা, সাক্ষরতা ধরে রাখা কিংবা সাক্ষরতা ভুলে না যাওয়ার জন্য কোনো ধরনের পরিকল্পনা বা ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে অসংখ্য সাক্ষরতা কর্মসূচিতে কাজ করা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এসব কারণে শিক্ষার এবং শিক্ষার মার্জিনাল পয়েন্ট অর্থাৎ সাক্ষরতার বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।

যাদের অবস্থান সাক্ষরতার বহু ওপরে ছিল গত সতেরো-আঠারো মাসে তাদের অনেকেই সেই যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে অর্থাৎ নিরক্ষরতার কাতারে শামিল হয়েছে। আমি নিজে আগস্টের ৩০ তারিখ থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রংপুর-গাইবান্ধার বিভিন্ন বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অবস্থা জানার জন্য বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছি। শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিষয় লিখতে যখন বলা হলো দেখলাম যে লেখা তারা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লেখার কথা তা লিখতে কয়েক মিনিট লগিয়ে দিচ্ছে, তার পরও লিখতে পারছে না। আমি নিজে বুঝলাম এবং সংশ্লিষ্টরাও বলল যে, এত দিন লেখার অভ্যাস নেই বলে এ অবস্থা হয়েছে। ডিজিটাল সভ্যতার এই যুগে সাক্ষরতাকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, তা না হলে বৈশ্বিক অগ্রগতি সমতালে তো নয়ই বরং বহু ব্যবধান নিয়ে এগোবে। ডিজিটালি পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০১৭ সালে তাদের একটি রিপোর্টে দেখিয়েছিল যে, ওই বছর প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৮.৪ শতাংশ এবং যে শিশুরা কখনোই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি কিংবা যায়নি তাদের হার প্রায় ২ শতাংশ। এই হারের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়েছে যে, সারা দেশে ৮-১৪ বছর বয়সী প্রায় ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন শিশু রয়েছে যারা বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছে অর্থাৎ এই অপার সম্ভাবনাময় শিশুরা নিরক্ষর। সরকার যদিও বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী সব শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে দারিদ্র্যের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হয় কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি কিংবা কখনো প্রাথমিকে ভর্তি হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রোগ্রামের (পিইডিপি-৪) আওতায় ‘আউট অব স্কুল চিলড্রেন প্রোগ্রাম’ এসব শিশুর দ্বিতীয় সুযোগ হিসেবে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসছে এবং এটি ২০২১ জানুয়ারি মাসে প্রথমবারে ৮-১৪ বছর বয়সী পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি করার কথা। সে কাজটি কিন্তু সেভাবে এগোয়নি এই করোনার কারণে। এই উদ্দেশ্যে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যুরোর এনজিওদের সহায়তায় সারা দেশে ৩২০০০ ও বেশি লার্নিং সেন্টার স্থাপন করার কথা। বর্তমানে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যুরো দেশের ছয়টি জেলায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, গাইবান্ধা, সিলেট ও সুনামগঞ্জে) পাইলট প্রোগ্রাম হিসেবে চালাচ্ছে এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য। এই পাইলট প্রজেক্ট শেষ হতে যাচ্ছে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। তবে, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির কারণে এটি হয়তো মার্চ ২০২২ পর্যন্ত গড়াবে। তাতে কি আমরা এই শিশু শিক্ষার্থীদের ডিজিটালি সাক্ষর করতে পারব? প্রায় দুই বছর এসব শিশু বইয়ের সংস্পর্শে থাকতে পারেনি। এমনিতেই তাদের যে বিরতি থাকে মূলধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে, করোনা সেই বিরতিকে আরও বাড়িয়ে দিল। তাই, আমার মনে হয় এই শিশুদের অর্থাৎ যাদের ওপর পাইলটিং করা হয়েছে তাদের বিরতি কাটানোর জন্য, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য কমপক্ষে পুরো ষষ্ঠ শ্রেণিটিই এই প্রজেক্টের আওতায় তাদের ধরে রাখার ব্যবস্থা করা উচিত।

আমাদের দেশের অসহায় ও বঞ্চিত পথশিশুদের জন্য রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) প্রকল্পের আওতায় দেড় শতাধিক উপজেলায় ২২ হাজারেরও বেশি আনন্দ স্কুলে মোট ৬ লাখ ২৪ হাজার ১০৪ জন পথশিশু শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় এরই মধ্যে এ প্রকল্পের অনেক স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আঠারো মাসের করোনাকালীন বন্ধে এসব আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। এই যোগাযোগ না থাকার অর্থ হচ্ছে এখানকার শিশুরা যতটুকু সাক্ষরতা অর্জন করেছিল চর্চার অভাবে তা ভুলে গেছে। অবস্থা স্বাভাবিক হলে এসব শিশুর কত শতাংশ পড়াশোনায় ফিরে আসবে তা সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। আবার যারা আসবে তারাও যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে এবং পড়াশোনা বুঝবে তাও কিন্তু নয়। তাদের জন্য প্রয়োজন হবে বিশেষ ব্যবস্থা যা হারিয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়া পড়া ও লেখার দক্ষতা উদ্ধার হওয়ার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু আমরা কি সে ধরনের কোনো ব্যবস্থার কথা শুনছি বা দেখছি?

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে পথশিশুদের ৫১ শতাংশ অশ্লীল কথা বলে, ২০ শতাংশ শারীরিক এবং ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। পথশিশুদের ২৫-৩০ ভাগ মেয়ে, তাদের মধ্যে ৪৬ ভাগ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক এনহেন্সমেন্ট প্রোগ্রামের (সিপ) গবেষণা অনুযায়ী পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত, ৪১ শতাংশের ঘুমানোর কোনো বিছানা নেই, ৪০ শতাংশ গোসল করতে পারে না, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে, ৫৪ শতাংশ অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই এবং ৭৫ শতাংশ অসুস্থ হলে ডাক্তারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে পারে না। পথশিশুদের ৮২ শতাংশ নানা ধরনের পেটের অসুখে এবং ৬১ শতাংশ কোনো না কোনো চর্মরোগে আক্রান্ত। একই গবেষণায় বলা হয়েছে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ পথশিশু একটি নির্দিষ্ট স্থানে সর্বোচ্চ ছয় মাস থাকে। এই বিশালসংখ্যক শিশু যাদের থাকার স্থায়ী জায়গা নেই, নেই বাবা-মায়ের কোনো খোঁজখবর, তারা নেই বিদ্যালয়ে, কে কোথায় কেমন আছে নেই তার কোনো খবর। এটি একটি বিশাল সামাজিক অনাচার। এই শিশুরা সমাজে এভাবেই বেড়ে উঠছে! বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কর্র্তৃক পরিচালিত অস্থায়ী কিছু বিদ্যালয়ে তারা সাধারণ মানের কিছু শিক্ষা পেত যা এরই মধ্যে ভুলে গিয়েছে কোনো কঠিন কাজ করতে গিয়ে, নয়তো কোনো অসামাজিক কাজ করতে গিয়ে। এদের সাক্ষরতা পুনরুদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা হবে কি? নাকি আমরা এসি রুমে বসে পাওয়ার পয়েন্টে প্রেজেন্টেশন দিয়ে এদের নিয়ে কথা বলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব?

লেখক : শিক্ষক ও শিক্ষাবিষয়ক লেখক

netairoy18@yahoo.com