তবে তারা পিৎজা-পাস্তা খাক

ফরাসি বিপ্লবের সময়ে ফ্রান্সের রানী (রাজা ষোড়শ লুইয়ের স্ত্রী) ছিলেন মারি এন্টোয়েনেট। বিপ্লবের আগে এই রানীর একটি উক্তি বিখ্যাত হয় : ‘ছঁ’রষং সধহমবহঃ ফব ষধ নৎরড়পযব’। এর সহজ ইংরেজি অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘তবে তারা কেক খাক’। যদিও ময়দার সঙ্গে ডিম আর মাখন দিয়ে প্রস্তুত করা নৎরড়পযব সাধারণ রুটির চেয়ে অনেক উন্নত এবং দামি খাবার হলেও এটিকে ঠিক কেক বলা যায় না। কেউ একজন রাজ্যে চরম খাদ্যাভাবের বর্ণনা রানীর কাছে দিয়ে জানায় অবস্থা এতই খারাপ যে মানুষ রুটিও খেতে পারছে না। তখন তার জবাবে রানী ওই কথাটি বলেন। উক্তিটি তার কি না সেটা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক থাকলেও উক্তিটি মারি এন্টোয়েনেটের নামেই প্রচারিত।

ফ্রান্সের রানী হওয়ার আগে মারি এন্টোয়েনেট ছিলেন রাজকন্যা। বিয়ের আগে এক বিশাল সাম্রাজ্যের রাজকন্যা এবং তারপর আরেক বিশাল সাম্রাজ্যের রানী হওয়ার কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই তার জীবন ছিল প্রকাণ্ড সব প্রাসাদের চৌহদ্দির মধ্যে বন্দি। এক রকম বন্দিত্বের মধ্য থেকে বাইরের পৃথিবীর খোঁজখবর সেই সময়ে পাওয়ার সহজ উপায় ছিল না। রানী তো রাজ্য পরিচালনা করেন না আর তাই সাধারণ মানুষ কী খায়, কীভাবে বাঁচে সেটা যদি মারি নাও জেনে থাকেন, তাহলেও তাকে খুব বেশি দায়ী করা যায় না। তিনি ছিলেন দুর্গেশনন্দিনী, থাকতেন নিজের জগতে। বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা সেই নারীর তাই রুটি খেতে না পারা মানুষকে নৎরড়পযব খাবার পরামর্শ কতটা গর্হিত অপরাধ সেটা আলোচনার দাবি রাখে। 

আমাদের দেশে গত এক দশক যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের জীবন খুব সম্ভবত মধ্যযুগীয় সেই রানীর মতোই। আরাম-আয়েশে ভরা স্বপ্নের জীবন তাদের। রানীর সঙ্গে অবশ্য আমাদের ক্ষমতাসীনদের বড় একটা পার্থক্য আছে। রানী যেহেতু দায়িত্বে ছিলেন না, তাই তার জবাবদিহিরও প্রশ্ন ছিল না। আর আমাদের বর্তমান সরকারটি দায়িত্বে থাকলেও জবাবদিহির থোড়াই কেয়ার করে। অবশ্য জবাবদিহির প্রশ্ন তখনই আসে যখন ভোটের জন্য মানুষের কাছে ফিরতে হয়। মানুষের কাছে ফেরার বালাই না থাকলে যাচ্ছেতাই যেমন করা যায়, তেমনি যা মুখে আসে অবলীলায় বলাও যায়। এমনকি ভাতের খোঁটা দিতেও বাধে না।

এই যেমন গত ২৪ অক্টোবর রাজধানীর এক পাঁচতারকা হোটেলে বসে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রতি প্রায় ২০০ গ্রাম চাল খেয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে চাল খাওয়ার পরিমাণ প্রায় ৪০০ গ্রাম। এটা কমিয়ে আনতে পারলে আমাদের যে চালের উৎপাদন, সেটাকে টেকসই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব... খাদ্যের অভাব নেই দেশে। নেই খাদ্যের সংকট ও খাবারের জন্য হাহাকার। কিন্তু মানুষ অধিক ভাত খায় বলে চালের ওপর বেশি চাপ পড়ছে। এতে প্রায়শ সংকট দেখা দিচ্ছে। বাড়ছে দামও।’ একই সঙ্গে ভাতের বদলে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

মন্ত্রীর এই উক্তি নিয়ে চারপাশে সমালোচনার ঝড় উঠলে দুদিন পর তার মন্ত্রণালয় অবশ্য বিবৃতি দিয়ে বলে তাকে উদ্ধৃত করে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা অসত্য। তিনি নাকি এমন কিছুই বলেননি। তাদের মতে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কৃষিমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতেই এই ভিত্তিহীন ও অসত্য সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। মুশকিল হলো আমরা এমন একটা সময়ে আছি যখন বক্তব্য কেবল ছাপার অক্ষরে আসে না। অডিও, ভিডিও সবই একসঙ্গে চলে আসে। হ্যাঁ, সরকারে থাকলে ক্ষমতার জোরে অনেক কিছুই সরিয়ে বা মুছে ফেলা যায় এবং তা করাও হয়। তবে দেশের ডাকসাইটে সব জাতীয় দৈনিক কেন তার মতো সজ্জন রাজনীতিবিদকে নিয়ে ‘মিথ্যাচার করল’ সেটি আমার বোধগম্য নয়।

যাই হোক, আলোচনায় ফিরি। বাংলাদেশে ৮ থেকে ১০ কোটি মানুষ কায়িক পরিশ্রমনির্ভর শ্রমের ওপর ভিত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের ক্যালরির চাহিদা যেমন বেশি, তেমনই ভাত থেকেই তারা তাদের ক্যালরির চাহিদা পূরণ করে। ভাত ছাড়া আর যেসব খাবারে প্রচুর ক্যালরি আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো ঘি, মাখন, ডিম, পনির, গরু-খাসির মাংস, আলু, কিশমিশ, খেজুর, দই, কলা ইত্যাদি। এক গ্রাম ভাতের সমপরিমাণ ক্যালরি পেতে গেলে কত টাকার কী পরিমাণ ঘি-মাখন খেতে হবে, সেই পরিমাণ ঘি-মাখন খাওয়ার সামর্থ্য আমাদের দরিদ্র সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলোর আছে কি না সে হিসাব কি মন্ত্রী মহোদয়ের আছে? আচ্ছা ঘি-মাখন-ডিম-পনির না হয় ছেড়েই দিলাম। সেগুলো বহু দূরের বিষয়। অনেক আগে একবার আলু খেয়ে চালের সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানানো হয়েছিল। এটুকু হিসাব তো জানার কথা : ভাতের সমান ক্যালরি পেতে ভাতের অন্তত তিন গুণ পরিমাণ আলু খেতে হবে মানুষকে। এতে ব্যয়ের পরিমাণ ভাতের চেয়ে বেশি বৈ কম হবে না। 

বলাই বাহুল্য, এসবের খোঁজখবর রাখেন না কৃষিমন্ত্রী। রাখার হয়তো প্রয়োজনও পড়ে না। না হলে নিজের টাকায় কিনে খাওয়া ভাতের খোঁটা খেতে হয় মানুষকে? এমন তো নয় যে, বিনা পয়সায় ঘরে ঘরে চাল পৌঁছে দিচ্ছে সরকার। ১০ টাকা কেজি চালের প্রতিশ্রুতি ভোটের আগে চমক সৃষ্টির জন্য দেওয়াই যায়, কিন্তু ভোটের পরে সে কথা মনে রাখে কে? আর মনে রাখে না বলেই ৭০ টাকা কেজি চালের ভাত জনগণকে খেতে হচ্ছে।

মন্ত্রী মহোদয় যখন পাঁচতারকা হোটেলে বসে ভাতের বিকল্প অন্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছিলেন, তখন নিশ্চিতভাবে তার মনেই ছিল না এটা করোনাকাল। যেই করোনায় দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। সরকার যদিও অস্বীকার করে চলেছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, সানেম, ব্র্যাক-পিপিআরসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা অন্তত তাই বলছে। মানুষ কাজ হারিয়েছে, শহর ছেড়েছে। চাকরি যাদের আছে, তাদের অনেকেরই বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বেড়েছে খালি জীবনযাপনের খরচ আর নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম।

সরকারের কিছু মন্ত্রী প্রতিদিন কথা বলেন। সম্ভবত কথা বলাই তাদের একমাত্র কাজ। কথার কোনো অর্থ থাক বা না-ই থাক, বিনোদন থাকে প্রচুর। নানামুখী চাপের এই জীবনে বিনোদনের প্রয়োজনও অস্বীকার করা যায় না। বলতে দ্বিধা নেই, কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক তাদের একজন নন। সেই স্বাক্ষরও তিনি কিছুদিন আগেই রেখেছেন। শারদীয় দুর্গোৎসবে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সিরিজ হামলার দায় কী করে বিরোধী দলের ওপর চাপানো যায়, সেটি যখন আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ মন্ত্রী-এমপি খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তখন আবদুর রাজ্জাক বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন, এটি তাদের জন্য দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক।

কিন্তু সিস্টেম বলে একটা বিষয় আছে। ঝামেলা পাকায় সেই সিস্টেম। সিস্টেম বা চক্রের অংশ যেই হয় তার আর রেহাই নেই। জনবিচ্ছিন্ন চিন্তা, জবাবদিহিহীন আচরণ তার মজ্জাগত হতে বাধ্য। দশচক্রে নাকি ভগবান ভূত হয়, রাজনীতিবিদ তো কোন ছাড়। গত ১৩ বছরে দুটি জাতীয় আর অনেকগুলো স্থানীয় নির্বাচনে মানুষের দরজায় যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি, ৫ বছরের হিসাব দেওয়ারও দায় কেউ বোধ করেনি। বরং সব ব্যর্থতার দায় মানুষের কাঁধে দেওয়ার একটা প্রবণতা চালু হয়েছে। করোনার সময় সংক্রমণ যখন ঊর্ধ্বগতি তখন বলা হলো মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, অথচ সরকারের সমন্বয়হীনতা, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা কিংবা মানুষকে আইন মানাতে ব্যর্থতা কী করে ঠিক করা যায় সে বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই।

একইভাবে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের মতো প্রতারক কোম্পানিগুলো যখন মানুষের হাজার কোটি টাকা লোপাট করল তখনো দায়ী করা হলো মানুষকে। সরকার বেমালুম ‘ভুলে গেল’ দিনের পর দিন কোটি টাকা খরচ করে এই কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন দিয়েছে, সরকারের মন্ত্রী-এমপি এনে অনুষ্ঠান করেছে, ক্রিকেট টিমের স্পন্সর হয়েছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা কোম্পানিগুলোকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণই ছিল না সাধারণ মানুষের। তারপরও দায়ী করা হলো মানুষের ‘লোভ’কে। একই গল্প শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে নিঃস্ব হওয়া মানুষগুলোর ক্ষেত্রেও বলা হলো। দায় চাপানোর এই ধারায় যুক্ত হলো চালের মূল্যবৃদ্ধি। মানুষেরই দোষ, তারা বেশি ভাত খেয়ে, চাহিদা বাড়ানোর মাধ্যমে চালের দাম আকাশে তুলে দিয়েছে।

ফরাসি বিপ্লবের আগে প্রজাদের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, সেটার মূল কারণ ছিল সাধারণ মানুষের তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, যার জেরে মানুষ ঠিকমতো ন্যূনতম খাবারও পাচ্ছিল না। প্রজারা জানত, এর পেছনে নানা কারণ আছে। তবে এর সঙ্গে তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছিল রানীর অতি আয়েশি, জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন। এই ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয় রানীর নামে প্রচারিত সেই উক্তি।

মানুষের সংকটে, বিপদে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সচেতন থাকা উচিত স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এমনিতেই করোনায় কাজ হারানো বিপর্যস্ত মানুষ যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে অস্থির, এমনকি মধ্যবিত্তও ভাতের চালের হিসাব কষছে, তখন মন্ত্রীর কথায় মনে হতেই পারে, মানুষ কেন ভাতের ওপর চাপ কমিয়ে পিৎজা-পাস্তা খেতে মন দিচ্ছে না! ভোটের হিসাব যদি নাও রাখেন কথার অন্তত হিসাব করেন, না হলে তার মাশুল কোনো না কোনোভাবে দিতেই হবে।

লেখক আইনজীবী, সংসদ সদস্য ও বিএনপিদলীয় হুইপ