দেশের স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের জন্য আশার আলো জ্বেলেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগ। এই বিভাগের সর্বাধুনিক ক্যাথল্যাবে হচ্ছে স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের মস্তিষ্কে রিং তথা স্টেন্ট বসানোর মতো উন্নত চিকিৎসা।
হৃদ্রোগ হলে হার্টে রিং তথা স্টেন্ট বসানোর বিষয়টি প্রায় সবারই জানা। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার এই যুগে এখন স্ট্রোকে আক্রান্তদের মস্তিষ্কেও একই ধরনের সার্জারি হচ্ছে।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে একমাত্র ঢামেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগেই রয়েছে এই বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা।
বিশ্ব স্ট্রোক দিবসকে সামনে রেখে গত ২৭ অক্টোবর নিউরোসার্জারি বিভাগের সেমিনার হলে এক ‘লাইভ স্ট্রোক ইন্টারভেনশন’ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে স্ট্রোকে আক্রান্ত এক রোগীর মস্তিষ্কের রক্তনালীতে রিং তথা স্টেন্ট বসানোর দৃশ্য সরাসরি স্ক্রিনে দেখানো হয়।
নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই কারণে স্ট্রোক হয়ে থাকে। এক. মস্তিষ্কের রক্তনালীতে রক্তক্ষরণ। দুই. মস্তিষ্কের রক্তনালী বন্ধ হয়ে যাওয়া।
তিনি বলেন, মস্তিষ্কের রক্তনালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ৮০ শতাংশ স্ট্রোক হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যাওয়া রক্তনালীতে রিং তথা স্টেন্ট বসিয়ে সেটা আগের অবস্থায় নেওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে অধিকাংশ রোগীই সুস্থ হয়ে যান।
ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীকে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা দেওয়া গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিকিৎসা নিয়ে পরদিনই রোগী হেঁটে বাসায় ফিরতে পারবেন। অনেকে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীকে হৃদ্রোগ ভেবে সময় নষ্ট করেন, যা রোগীর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
তিনি জানান, স্ট্রোক চিনতে তিনটি বিষয় খেয়াল করতে হবে। এক. মুখ একদিকে ঝুলে পড়া। দুই. হাত একদিকে ঝুলে পড়া। তিন. কথা জড়িয়ে যাওয়া।
স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর ৩৬ শতাংশই অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত জানিয়ে নিউরোসার্জারির এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, ‘খাদ্যাভ্যাসের অনিয়ম স্ট্রোকের অন্যতম কারণ হিসেবেও আমরা দেখি। স্ট্রোকের রোগীর ২৩ শতাংশই জাঙ্ক ফুডে আসক্ত। এছাড়াও কোলেস্টেরল এইচডিএল কম থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে প্রায় ২৭ শতাংশ।’
উচ্চ রক্তচাপও এই রোগের অন্যতম কারণ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘স্ট্রোকে আক্রান্তের অন্যতম কারণ মানসিক চাপ। আর এই রোগে আক্রান্তদের ১৭ শতাংশ মানসিক চাপের শিকার।’
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রি. জেনারেল নাজমুল হক বলেন, স্ট্রোকের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ জটিল রোগী এই হাসপাতালে আসেন। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এই বিভাগের চিকিৎসকরা।
তিনি বলেন, ‘ঢামেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে গড়ে ছয় শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন। দিনে গড়ে ৫০ জনের মতো নতুন রোগী আসেন। তাদের মধ্যে প্রতিদিন ৭-১০ জনের সার্জারি করা সম্ভব হয়।’
ঢামেক হাসপাতাল পরিচালক বলেন, স্ট্রোকের রোগীদের চিকিৎসার জন্য ২০ শয্যার পৃথক স্ট্রোক সেন্টার প্রতিষ্ঠার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এখানে ১০টি আইসিইউ-এইচডিইউ শয্যা থাকবে। ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
আজ ২৯ অক্টোবর বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য- ‘না করলে সময়ক্ষেপণ, স্ট্রোক হলেও বাঁচবে জীবন’। নানা আয়োজনে গত বুধবার থেকে বাংলাদেশে দিবসটি উদ্যাপিত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি চারজনের একজন স্ট্রোকের ঝুঁকিতে আছেন। তবে আশার বিষয়, বিশ্বব্যাপী আট কোটি মানুষ স্ট্রোক আক্রান্ত হওয়ার পরও চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।