ইন্দিরার মতোই ঠেকে শিখলেন মোদি

আকস্মিক চমক দেওয়ার বরাবরের সুনাম ধরে রেখেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কৃষি বিষয়ক তিনটি বিতর্কিত আইন বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে তার ঘোষণা জনগণের কাছে এক বিশাল বিস্ময় হিসেবেই এসেছে। শিখ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র দিন ‘গুরু পরব’ ছাড়াও এটি ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জন্মদিন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তুলনা করাটা উপযুক্ত কারণ, তিনিও সত্তরের দশকের শেষদিকে জরুরি অবস্থা আর ধরে রাখা যাচ্ছে না বুঝতে পেরে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। যাবতীয় সাহসিকতার ভাব সত্ত্বেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একই ধরনের সিদ্ধান্তে এসেছেন। তিনি যেহেতু একজন ‘নির্বাচন-জীবী’, যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ উত্তর প্রদেশসহ পাঁচটি রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন সামনেই আর নিশ্চিত পরাজয় দিগন্তে মারছে উঁকি এইসব কালো আইন প্রত্যাহার করা ছাড়া তার আর কোনো উপায়ও ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওই ঘোষণার পরে নিজের এক টুইটে আমি বলেছিলাম, ‘কৃষি আইন প্রত্যাহার করায় সরকারের বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য কৃষকদের অভিনন্দন জানালেও আমি এই পদক্ষেপের জন্য সরকারের প্রতি কোনো মহৎ অনুভূতি ব্যক্ত করছি না। এটি উত্তর প্রদেশের নির্বাচনের জন্য একটি হিসাব করা পদক্ষেপ মাত্র। এই সরকারের জন্য গণতন্ত্রের শুরু এবং শেষ হয় নির্বাচন দিয়ে। তাই কথা একটাই। এ নির্বাচনী কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।’

সংসদে, বিশেষ করে রাজ্যসভায় ওই কৃষি বিষয়ক আইনগুলো পাসের ঘটনা সাংবিধানিক এবং সংসদীয় নৈতিকতা আর সরকারের আচরণ নিয়ে অনেকগুলো সমস্যাকে সামনে উঠিয়ে আনে। কেন্দ্রীয় সরকারের কি এমন কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা উচিত, যা রাজ্যের আইনসভার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে? অধ্যাদেশ জারি করার জন্য প্রচলিত সমস্ত নিয়ম লংঘন করে আইনগুলো কি প্রথমে অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করা উচিত ছিল? সত্যি বলতে, ভারতে কৃষির সমস্যাগুলো খোদ কৃষিকাজের মতোই প্রাচীন। তাই এসব বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করার এত তাড়া কি ছিল?

তারপর, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মতামত ছাড়াই কি সরকারের সংসদে বিষয়টা এমন বাজেভাবে গায়ের জোরে এগিয়ে নেওয়া উচিত হয়েছে? স্থায়ী কমিটির দ্বারা যাচাই-বাছাই হলে সব অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করা সম্ভব হতো। এটাই তো এখন আদর্শ সংসদীয় রীতি। সরকারের কেউ কি এখনো উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করবে যে, এই আইনগুলো প্রথমে অধ্যাদেশ হিসেবে এবং তারপর আইন করতে সংসদে ঝড়ের বেগে এগিয়ে নেওয়ার তাড়াটা ঠিক কী ছিল? আইনগুলো না হয় বাতিল করা হলো। ভালো কথা। এখন বাতিলের বিষয়টি কি রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যানকে অসংসদীয় আচরণে লিপ্ত হওয়া আর সরকারের পক্ষে একতরফা সমর্থন দেওয়ার দায় থেকে অব্যাহতি দেবে?

সেদিন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি যে নম্রতা প্রদর্শন করেছেন এমনকি তার ক্ষমাপ্রার্থনাও তা জনগণকে নাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তার উদ্দেশ্যটি সৎ ছিল না, বরং ছিল কলঙ্কিত। ভারতের কৃষকরা যে এই আইনের বিরোধী ছিলেন তা বুঝতে তার এত সময় লাগল কেন? কেন শত শত কৃষককে প্রাণ দিতে হলো তাকে এটা বোঝাতে যে তারা এসব আইন পছন্দ করেননি? খোলা আকাশের নিচে দুপুরের কাঠফাটা রোদে বা রাতের তীব্র ঠা-ায় কষ্ট সহ্য করে হাজার হাজার কৃষকের অবস্থান কর্মসূচি কেন প্রধানমন্ত্রীকে নাড়া দেয়নি? জাতীয় রাজধানীর এত কাছাকাছি ঘটে চলা বিষয়গুলো কেন তাকে স্পর্শ করতে ব্যর্থ হলো? কেন তিনি একজন মন্ত্রীকে কৃষকদের প্রতি সমবেদনা জানাতে তাদের অবস্থান কর্মসূচির স্থানে পাঠালেন না?

নতজানু মিডিয়া আর সর্বব্যাপী বিরাজমান সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী যে হতাশাজনক ছবিটি তুলে ধরেছেন তার জন্য ভারতের জনগণ দায়ী নয়। মোদির ভক্তরাই শুধু বলেন যে, তিনি ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। তারা আমাদের বরাবর বোঝানোর চেষ্টা করে আসছেন, তিনি অভ্রান্ত, শক্তিশালী এবং সাহসী। কিন্তু মোদি একজন রাষ্ট্রনায়ক বলে তাদের যে দাবি তা আর কেউ কানেই তুলবে না। ব্যক্তিগত খ্যাতির জন্য অনেকখানি নির্ভর করা কৃষি আইন বাতিলের এই পর্বটি প্রমাণ করেছে, নরেন্দ্র মোদি একইসঙ্গে দুর্বল এবং ভ্রান্ত, তিনিও আমাদের সবার মতো ভুল এবং অনুশোচনা করেন। তার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্ভবত তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, গোটাকয় করপোরেট বন্ধু তার এটিএম হতে পারে, কিন্তু তারা নির্বাচনে ভোট এনে দেবে না।

এখন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তুলনার বিষয়ে আসা যাক। ইন্দিরার একটা খ্যাতি ছিল যা মোদির চেয়ে অনেক বেশি সমীহ জাগানো। একটি নতুন দেশ গঠনের কৃতিত্ব দেওয়া যায় ইতিহাসে এমন কয়জন ব্যক্তিত্ব আছে বলুন! অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপটে নিজের অত্যাশ্চর্য নির্বাচনী বিজয়ের চার বছরের মধ্যে ইন্দিরা এতটাই অজনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে, তিনি ঘাবড়ে গিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করে বসেন। পরে জনগণের রায় চাইতে তাদের কাছে গিয়ে হেরে গিয়েছিলেন ইন্দিরা। জনগণ তাকে এমন এক শিক্ষা দিয়েছিল যা ভোলার নয়। ভারতীয় জনগণের প্রতি আমার বিশ্বাস তখনই দৃঢ় হয়েছিল। আজ তা পুনরুজ্জীবিত। আমি মনে করি ভারতের গণতন্ত্র এখনো বহাল তবিয়তে আছে। তখন জনতা পার্টি ও ছাত্রদের আন্দোলন ইন্দিরা গান্ধীকে পরাস্ত করেছিল। আজ জনতা পার্টি নেই। সম্ভবত তার আর প্রয়োজনও নেই। কারণ, ভারতের কৃষকরা দেখিয়ে দিয়েছেন, ইচ্ছা এবং দৃঢ় সংকল্প থাকলে যে কেউ করে দেখাতে পারে। জনগণ অতীতে স্বৈরাচারীদের নত করেছে, তারা আরও একবার তা করল এবং ভবিষ্যতেও আবার করবে।

এনডিটিভি অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

লেখক সাবেক বিজেপি নেতা, অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক তৃণমূল কংগ্রেসের সহ-সভাপতি