রাজপথ এখন নানা ধরনের প্রতিবাদ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি এবং বিক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্র। শ্রমিকরা নেমেছেন তাদের চাকরি আর মজুরির দাবিতে, ছাত্ররা নেমেছে বাসে হাফ ভাড়া নিতে হবে এই দাবিতে আর বামপন্থি রাজনৈতিক দলসমূহ জনজীবনের নানা সমস্যা নিয়ে প্রায় প্রতিদিন তাদের কর্মসূচি পালন করছে। রাজনৈতিক দল রাজপথে তাদের দাবি-দাওয়া জানাবে এটাই স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার। এবং বাংলাদেশে বিশেষভাবে এটা বিরোধী দলের জন্য যেন অবধারিত। কারণ তাদের কথা বলার, দাবির কথা জনগণকে জানানোর, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে চাপ দেওয়ার আর তো কোনো পথ, পদ্ধতি এবং স্থান তো এখন আর নেই। স্বাধীনতার আগে ঢাকায় পল্টন ময়দান ছিল, রেসকোর্স ময়দান ছিল, রাজনৈতিক দলগুলো সেখানে সমাবেশ, জনসভা করে তাদের কথা বলত। কিন্তু তখনো বিক্ষোভ প্রকাশ করতেন রাস্তায় বা রাজপথে। বহুল প্রচলিত স্লোগান ছিল ‘গোলটেবিল না রাজপথ রাজপথ রাজপথ, দালালি না রাজপথ রাজপথ, রাজপথ’। অর্থাৎ আন্দোলন হতো প্রকাশ্যে আর দালালি হতো গোপনে বা টেবিলে। স্লোগানের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠত রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা আর জনসভায়, মিছিলে প্রকাশিত হতো প্রতিজ্ঞা। আন্দোলনকারীরা রাজপথের মিছিলে দেখাতেন তাদের শক্তি আর ক্ষমতাসীনরা দমন-পীড়ন চালিয়ে তাদের ক্ষমতার দম্ভ এবং শক্তির প্রকাশ ঘটাতেন। এখন ক্ষমতাসীনদের শক্তি প্রদর্শনের অনেক পথ এবং পদ্ধতিই ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও স্বাধীনতার পর থেকে ক্রমাগত জনসমাবেশ করার জায়গাগুলো বন্ধ করে দেওয়া এবং সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। তবু আন্দোলন করতে গেলে রাজপথই এখনো প্রধান ভরসার জায়গা।
স্কুল-কলেজের ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এসেছে পরিবহনে বিশেষত বাসে তাদের হাফ ভাড়া কার্যকর করার জন্য। দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে এমন কোনো জিনিস নেই যা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে না। মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় চাল, চিনি, তেলসহ খাদ্যপণ্য তো আছেই, রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সবকিছুর দাম বাড়াতে তেমন কোনো অজুহাতও এখন আর প্রয়োজন হয় না। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আবদার এবং সরকারের অনুমোদন একটা যুগলবন্দির মতো পরিবেশ তৈরি করেছে। পরস্পর পরস্পরকে সহায়তা করে সরকার ও ব্যবসায়ীদের এই যৌথ সংগীতের মূর্ছনায় সাধারণ মানুষের মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম। এর সঙ্গে আছে ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা-মন্ত্রীদের উপদেশ ও অপমানসূচক কথাবার্তা। বিদেশিরা চাল-গম কম খায়, আমরা ভাত বেশি খাই তাই খাদ্যঘাটতি! অতএব ভাত কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার সহজ পথ বেছে নিয়েছেন তারা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যায় মুনাফার ব্যাপারে তাদের নীরবতা ভীষণ অর্থ বহন করে। এরপর আবার বলা হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলে সব তেল ভারতে পাচার হয়ে যাবে। কিন্তু সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্ব যাদের তাদের সতর্ক না করে তারা শাস্তি দিলেন সাধারণ মানুষকে। কৃষকরা কম দামে তেল পেলে তা কৃষি উৎপাদনে সহায়ক হতো কি না সে বিষয় কি আলোচনার অপেক্ষা রাখে? কৃষি মন্ত্রণালয় বলেছে, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বোরো মৌসুমে কৃষিতে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি বাড়তি খরচ করতে হবে ধানচাষিদের। দেশের ১৬ লাখ সেচ পাম্পের ৭০ শতাংশের বেশি চলে ডিজেল দিয়ে। এতে প্রতি বিঘায় সেচ খরচ বাড়বে ৩০০ টাকার বেশি। আমন ধান কাটা শেষ। বোরো মৌসুম শুরু হবে। এই বোরো মৌসুমে দেশের ধানের ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদন হয়। ফলে সরকারের তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব কৃষকের ক্ষেতে আর জনগণের পাতে সরাসরিই পড়বে।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাড়িয়ে দেওয়া হলো পরিবহনের ভাড়া। সরকার তেলের দাম বাড়াল ২৩ শতাংশ। পরিবহনের ব্যয়ের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল একমাত্র উপাদান নয়। বাস বা ট্রাকের দাম, পরিচালন খরচ, ড্রাইভার-হেলপারের বেতন, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, অবচয়, অদৃশ্য খরচ (বিআরটিএর ঘুষ, পুলিশ খরচ, চাঁদা ইত্যাদি), কত সিট খালি থাকে ইত্যাদিসহ ১৬ ধরনের বিষয় যুক্ত করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়ে থাকে বলে বলা হয়। সাধারণত মোট খরচের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হয়ে থাকে জ্বালানি তেল বাবদ। এক হিসাবে দেখানো হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসের ভাড়া ৬ থেকে ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। কিন্তু ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২৭ শতাংশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরে প্রতি কিলোমিটারে ৪৫ পয়সা বাড়িয়ে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৫ পয়সা। কিন্তু ভাড়া তো আগেও বেশি নেওয়া হতো আর এখন তা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন প্রেস ক্লাব থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত দূরত্ব চার কিলোমিটারের বেশি নয়। বর্ধিত ভাড়া অনুযায়ী এই ভাড়া হওয়ার কথা ৮ টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু আগে নেওয়া হতো ১০ টাকা আর এখন তা নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। সাধারণ মানুষ বাসে প্রতিদিন ঝগড়া করছে বাড়তি ভাড়া নিয়ে। বাসের কন্ডাক্টর বলছেন মালিক প্রতি ট্রিপে তার জমা বাড়িয়েছেন ১৫০০ টাকা। বেশি ভাড়া আদায় না করলে তারা এটা দেবেন কোথা থেকে? ঝগড়া কখনো রূপ নিচ্ছে মারামারিতে। যাত্রী আর পরিবহন শ্রমিক মারামারি করছেন, মুনাফা যাচ্ছে পরিবহন মালিকের পকেটে।
ছাত্ররা তুলনামূলক সংগঠিত। কলেজের সামনে থেকে বাসে ওঠে, কলেজের সামনে নেমে যায়। ফলে তারা কিছুটা হলেও শক্তি দেখাতে পারে। বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন একজন ছাত্রের খরচ বেড়ে গিয়েছে ৩০-৪০ টাকা। একদিকে খরচের চাপ, অন্যদিকে অযৌক্তিক তেলের দাম ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি ছাত্রদের প্রতিবাদী করে তুলেছে। তারা চাইছে পরিবহনে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করার অধিকার। যদিও এই দাবি ছাত্রদের দীর্ঘদিনের দাবি। ৬৯ সালের ১১ দফাতেও গণপরিবহনে কনশেসনের দাবিটি ছিল। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও এই দাবিতে ছাত্ররা আন্দোলন করেছে, কিছু ক্ষেত্রে হাফ ভাড়া চালু হয়েছিল। আর এখন তো ছাত্ররা খবর পাচ্ছে যে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই ছাত্রদের জন্য বিশেষ পাস, টিকিট, কনশেসনের ব্যবস্থা আছে। ছাত্ররা এখন ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলের উন্নয়ন দেখছে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হিসাব পত্রিকায় পড়ছে, দুরন্ত গতিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা শুনছে দেশ নেতাদের কাছ থেকে! তাহলে ছাত্ররা, যাদের ওপর নির্ভর করবে দেশের অগ্রযাত্রা তাদের জন্য রাষ্ট্র ভর্তুকি দেবে না কেন? এই ভর্তুকির টাকা তো আসবে জনগণের কাছ থেকে। জনগণের টাকা তাদের সন্তানদের জন্য ব্যয় করা হবে না কেন? কেন তাদের সন্তানরা পরিবহন মালিকদের মুনাফার শিকারে পরিণত হবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ডের সঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব নেওয়া হবে না কেন যাতে পরিবহন মালিকরা তাদের কাছে হাফ ভাড়া নেন। একজন ছাত্র গড়ে কতবার বাসে ওঠে, তার কাছে হাফ ভাড়া নিলে কত টাকা কম আয় হবে, এর কত অংশ সরকার দেবে, কত অংশ মালিক বহন করবেন এ নিয়ে একটা সমীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া কি খুব কঠিন বিষয়? ছাত্র এবং পরিবহন শ্রমিকদের মুখোমুখি বিরোধে জড়ালে যে আর্থিক ক্ষতি ও সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয় তার তুলনায় কি হাফ ভাড়া অনেক কম নয়? সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের ছাত্ররা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিবহন কার্ড পেতে পারে, রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিবহন বরাদ্দ দিতে পারে কি না, ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকার শিক্ষা-বাজেটে আর কত টাকা বরাদ্দ বাড়ালে পরিবহনে ছাত্রদের জন্য সাবসিডি দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা এখন জরুরি।
গার্মেন্টস শ্রমিকরা রাজপথে নেমেছেন তাদের বকেয়া বেতন ও চাকরির দাবিতে। প্রায় প্রতিদিন বিক্ষোভ করছেন তারা। পুলিশ এবং সরকারদলীয় স্থানীয় সন্ত্রাসীদের আক্রমণে আহত হচ্ছেন তারা। যে মজুরি তারা পান তাতে সংসার চলে না। এরপর যদি বেতন বকেয়া থাকে, চাকরি থেকে ছাঁটাই হয়ে যান তাহলে বিক্ষোভে ফেটে পড়া ছাড়া আর কি উপায় আছে তাদের?
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পেতে আন্দোলন করে যাচ্ছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। চিকিৎসাব্যবস্থার বেহাল দশা তো আমরা সবাই জানি, এর দায় যারা ক্ষমতায় ছিলেন এবং আছেন তারা কেউই এড়াতে পারেন না। সাধারণ মানুষের কোনো উপায় নেই, যাদের উপায় আছে তারা ছুটে যান বিদেশে চিকিৎসা করাতে। এ ক্ষেত্রে অসুস্থতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক। চিকিৎসার অধিকার এখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারে পরিণত হয়েছে।
ক্ষমতায় যারা থাকেন তারা ক্রমাগত বলতে থাকেন তারা যা করছেন সেটাই দেশের জন্য ভালো। রাষ্ট্র সব মাধ্যমে তা প্রচার করছে এবং প্রশাসনও এই প্রচারণার সর্বোত্তম ব্যবহার করছে। কিন্তু এসবের দুর্বলতা দেখিয়ে দিলে, কিংবা ভুল ধরিয়ে দিলে তারা ভীষণ ক্ষেপে ওঠেন। আন্দোলনের কথা শুনলে বলতে থাকেন, বিরোধীরা না জেনেই প্রতিবাদ করছেন, সরকারকে হেয় করছেন। আর তারা প্রচার করতে থাকেন বহুল প্রচলিত সেই তত্ত্ব যে, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে বিরোধীরা ষড়যন্ত্র করছেন। রাজপথে না কি নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। আসলে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। ক্ষমতার ছায়ায় থেকে যে যেভাবে পারে লুটপাট করছে। রাজপথে হচ্ছে প্রতিবাদ। কারণ প্রতিবাদের আর তো কোনো জায়গা নেই, প্রতিবাদের আর তো কোনো ভাষা নেই। আর প্রতিবাদের মধ্যেই তো বেঁচে থাকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। ফলে প্রতিবাদকে নিষ্ঠুর পথে দমন করা নয়, প্রতিবাদের কারণ খুঁজে দেখা দরকার, প্রতিবাদের ভাষা শুনে প্রতিকার করা দরকার।
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
rratan.spb@gmail.com