খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষক ড. মো. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সেলিমের মৃত্যু তারা শোকাহত ও ক্ষুব্ধ উল্লেখ করে মঙ্গলবার এক বিবৃতি দিয়েছে।
কুয়েটের লালন শাহ হলের খাদ্য ব্যবস্থাপক নির্বাচন নিয়ে কয়েক দিন ধরে ছাত্রলীগ নেতারা প্রভোস্ট ড. সেলিম হোসেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ১ ডিসেম্বর দুপুরে ছাত্রলীগ নেতারা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ও হুমকি দেয়। ওই দিনই সেলিমের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। অভিযোগে বলা হয়, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের লাঞ্ছনা ও অপদস্থের শিকার হওয়ার পর তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন।
সেলিম হোসেন ছিলেন কুয়েটের একমাত্র ক্রিপ্টোগ্রাফিতে পিএইচডি করা অধ্যাপক। তার ওপর ভিত্তি করে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে একটি নতুন ল্যাব তৈরির পরিকল্পনা ছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, ড. সেলিমের অকাল প্রস্থান কুয়েট তথা পুরো দেশের জন্যই একটা অপরিমেয় ক্ষতি হয়েই থাকবে।
আরও বলা হয়, এই শিক্ষক আজ বেঁচে থাকলেও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের এই ধরনের আচরণ অত্যন্ত গর্হিত একটি অন্যায় বলেই বিবেচিত হতো। একটা হলের ব্যবস্থাপনায় আছেন প্রভোস্ট। তিনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে যাকে নিয়োগ যেখানে দেওয়ার দরকার সেখানে দেবেন। এখানে ছাত্র সংগঠনের কী দায় থাকতে পারে? কী বলার অধিকার আছে?
শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলছে, বছরের পর বছর প্রতিটি ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের দৌরাত্ম্য নতুন কিছু নয়। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত হল প্রশাসন ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকা পালন করেন। কোন ছাত্র হলে কোন রুমে থাকবে এইগুলো সবই ঠিক হয় ছাত্র সংগঠনের নেতা-নেত্রীদের মর্জিমাফিক। এই প্রক্রিয়াতে চলে গণরুম আর গেস্টরুম নির্যাতন। হলের একটা সিটের বিনিময়ে কিনে নেওয়া হয় শর্তহীন রাজনৈতিক আনুগত্য আর ক্যাডার নামক রাজনৈতিক গুন্ডা বানানোর লাইসেন্স।
আরও বলা হয়, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমরা শিক্ষকেরা বছরের পর বছর শাসক দলের এই নষ্ট পরিকল্পনার অংশ হয়েছি এর প্রতিবাদ না করে অথবা এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। হল প্রশাসনে থাকা শিক্ষকেরা এই ছাত্র সংগঠনগুলোর খবরদারি বিনা শর্তে মেনে নিয়েছেন ঝামেলা এড়ানোর জন্য। আর সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষিকারা সব জেনে বুঝেও নীরব রয়ে গেছেন সবসময়।
একপর্যায়ে বলা হয়, সেলিম হোসেনের এই অকাল মৃত্যুর পরোক্ষ কারণ হয়তো আসলে আমরা শিক্ষকরাই।
মো. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর পূর্বাপর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত দোষীদের বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়ে তারা বলেন, কুয়েট কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত কোন পথে হাঁটছেন তা আমরা নিশ্চিত নই। মৃত্যুর প্রতিবাদে যখন কুয়েট উত্তাল হয়ে ওঠে তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তড়িঘড়ি করে কুয়েট বন্ধ ঘোষণা করে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের হল ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। এটি করার একটা উদ্দেশ্য হয়তো ছাত্র আন্দোলন স্তিমিত করে ফেলা।
এই শিক্ষকেরা বলেন, আমরা চাই কুয়েট কর্তৃপক্ষ কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে এই অপমৃত্যুর একটি সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনবে।
আরও জানানো হয়, ড. সেলিমের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্তে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষকেরা অবস্থান নিয়ে তাদের দাবি জানাবেন বুধবার বেলা ১২টায়।
বিবৃতিতে ৫১ জন স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে রয়েছেন আনু মুহাম্মদ, রুশাদ ফরিদী, মার্জিয়া রহমান, জি এইচ হাবীব. সৌভিক রেজা, অর্পিতা শামস মিজান, তাসনীম সিরাজ মাহবুব প্রমুখ।