মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার গাজীপুর চা-বাগানের শ্রমিক আরতি রানী দাস। স্বামী আর এক মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। দৈনিক মাত্র ১০৪ টাকা মজুরির এই চা-শ্রমিকের পরিবারে অভাব নিত্যদিনের সঙ্গী। সাংসারিক সব ভরণপোষণের সঙ্গে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ যেন বাড়তি বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। নিজে ও স্বামীর মজুরি মিলিয়ে খেয়ে না খেয়ে কোনো রকম দিন পার করা আরতি তবুও জুগিয়ে যাচ্ছেন মেয়ের লেখাপড়ার খরচ। স্বপ্ন দেখেন মেয়ে একদিন লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হবে। সেদিন দুঃখ ঘুচবে তাদের।
আরতির মতো শ্রমিকদের শ্রম আর ঘামে মৌলভীবাজারের চা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। তারা অবদান রাখছেন দেশের অর্থনীতির ভিত গড়তে। কিন্তু এসব চা-শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে নেই তেমন কোনো পদক্ষেপ। স্বামী-স্ত্রীর সামান্য আয়ে মেয়ের ভরণপোষণের পাশাপাশি লেখাপড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন আরতি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভাব-অনটনের সংসারে কোনো রকম দিন পার করছি। যে মজুরি পাই তা দিয়ে পারিবারিক খরচ চালানো সম্ভব হয় না। আমাদের চা-শ্রমিকের দিনযাপন এভাবেই কাটছে। কষ্টটাকেই আমাদের মেনে নিতে হয়। জীবনটা কষ্টের হলেও চালিয়ে নিতে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামান্য আয়ের সংসারে সন্তানের লেখাপড়া করানো বেশ কষ্টসাধ্য। মেয়ের বই, খাতা, কলমসহ শিক্ষাসামগ্রী দেওয়াটা এই আয় দিয়ে স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়। এরপরও যথাসাধ্য নিজে না খেয়েও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এভাবে আর কত দিন পারব, তা জানি না।’
আরতি জানান, অসুস্থ হলে উপজেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। আর জটিল কোনো রোগ হলে যেতে হয় সিলেটে। সেখানে যাতায়াতে খরচ হয় ৬০০-৭০০ টাকা। অর্থনৈতিক সংকট যথাযথ চিকিৎসা পাওয়াকে কঠিন করে তোলে। পরিবারের কারও জটিল রোগ হলে ভোগান্তির শেষ থাকে না।
এ প্রসঙ্গে চা-শ্রমিক নেতা সন্ন্যাসি নাইডু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরতির মতো এভাবে প্রায় সব চা-শ্রমিকই দিনযাপন করছে। চা-শ্রমিকদের জীবনধারা নিতান্তই কষ্টের। পরিবারের ভরণপোষণ খুব কষ্ট করে করতে হচ্ছে তাদের। শ্রমিকদের সামান্য মজুরি দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হয় না। এ ছাড়া শ্রমিক পরিবারের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা ও বাসস্থানের কষ্ট পোহাতে হয়।’
চা-শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক উল্লেখ করে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি যাতে চা-শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়ন হয়। চা-শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া বাস্তবায়ন এবং তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়ে সার্বিকভাবে আমরা সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।’ সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতি বছর চা-শ্রমিকদের সহযোগিতা করা হয় বলেও জানান ইউএনও।