চিকিৎসক ও কর্মী সংকট এবং নানা অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় ভেঙে পড়েছে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্যসেবা। উপজেলাটির প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে যথাযথ সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে। রোগীরা বিপাকে পড়ে স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী সাভারের বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে গিয়েও হচ্ছেন প্রতারিত। অনেক সময় ভুল চিকিৎসায় প্রাণও যাচ্ছে রোগীদের। এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যথাযথ চিকিৎসা না পেলেও গলাকাটা ফি দিতে গিয়ে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছে বহু মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আউটডোর ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিন তিনশোর বেশি রোগী এলেও চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা পান না। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজ জেলার এ হাসপাতালটিতে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা লোকজন বঞ্চিত হচ্ছেন কাক্সিক্ষত সেবা থেকে। ২০১১ সালে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়া এ হাসপাতালে মেডিকেল অফিসারের ২২টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ১২ জন। এর মধ্যে আবার ছয়জন বিভিন্ন জায়গায় প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি ছয়জন মেডিকেল অফিসার দিয়ে চলছে দায়সারাগোছের সেবাদান। হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ১০টি পদের বিপরীতে আছেন পাঁচজন। চক্ষু, ইএনটি, কার্ডিওলোজি, মেডিসিন ও শিশু বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) পদ থাকলেও তা শূন্য রয়েছে। শিশু বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা দেন চিকিৎসা।
এই হাসপাতালে চিকিৎসক ছাড়াও অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিকের দুটি, সহকারী সেবকের একটি, মেডিকেল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) একটি, স্টোরকিপারের একটি, স্বাস্থ্য পরিদর্শকের চারটি, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের একটি, স্বাস্থ্য সহকারীর ১২টি, সিনিয়র স্টাফ নার্সের দুটি, জুনিয়র মেকানিকসের একটি, এমএলএসএসের পাঁচটি, কুক মশালচীর একটি, আয়ার দুটি, নৈশপ্রহরীর একটি এবং ঝাড়ুদারের দুটিসহ ৩৭টি পদ শূন্য রয়েছে।
হাসপাতালের আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি মেশিন অকেজো দীর্ঘদিন ধরে। ডিজিটাল যুগে অ্যানালগ মেশিনে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এক্স-রে’র কাজ। রয়েছে সুপেয় বিশুদ্ধ পানির অভাব। জেনারেটর না থাকায় বিদ্যুৎহীন সময়ে ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। টয়লেট দুর্গন্ধযুক্ত ও ব্যবহারের অনুপযোগী।
হাসপাতালে ডেন্টাল ইউনিট থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে ডেন্টাল সার্জন ও সহকারীকে অফিসে বসে অলস সময় পার করতে হয়। দাঁতের যন্ত্রণায় কাতর রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। আবাসিক মেডিকেল অফিসার ছাড়া কোনো চিকিৎসকই কর্মস্থলে থাকেন না। সাভার কিংবা ঢাকা থেকে এসে অফিস করেন তারা। ৩৩ প্রকারের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহের কথা থাকলেও রোগীরা তা ঠিকমতো পাচ্ছেন না।
এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফারহানা কবিরের বিরুদ্ধে রয়েছে সেবা নিতে আসা লোকজনের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ। অধীনস্থ চিকিৎসক ও কর্মীদের সঙ্গেও তিনি রূঢ় আচরণ করেন বলে জানিয়েছেন অনেক কর্মী।
এদিকে হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে একটি দুর্ঘটনায় দুমড়েমুচড়ে পড়ে রয়েছে বছরখানেক ধরে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক কর্মী জানান, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সটি ডা. ফারহানা কবির তার ঢাকার বাসায় যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করতেন। চলতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি ভোরে তাকে ঢাকার বাংলা মোটরের বাসা থেকে আনতে যাওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সটি সাভারের আমিনবাজারে দুর্ঘটনার শিকার হয়।
তবে এতসব সংকটের পরও ডা. ফারহানা কবিরের দাবি, হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা ভালোভাবেই চলছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বর্তমানে হাসপাতালে ডাক্তারের তেমন কোনো সংকট নেই। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগও মিথ্যে।
অথচ মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘জনবল ও ডাক্তার সংকট রয়েছে বহু বছর ধরে। নিয়োগ হয় না, প্রক্রিয়াধীন আছে। সেটা শিগগিরই হয়ে যাবে।’