প্রাসাদ, রেসের ঘোড়া এবং সীমাহীন অর্থ: রাজকুমারী হায়ার বিলাসী জীবন

দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাকতুম এবং তার ৬ষ্ঠ স্ত্রী রাজকুমারী হায়ার মধ্যে আইনি লড়াই অতি-সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের রাজপরিবারের বিলাসবহুল জীবনধারাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাকতুমকে লন্ডনের হাইকোর্ট তার প্রাক্তন স্ত্রী রাজকুমারী হায়া বিনতে আল হুসেনকে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন পাউন্ড (সোয়া ৬ হাজার কোটি টাকা) দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। জানা গেছে যে, কোনো ব্রিটিশ আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের সর্বোচ্চ বন্দোবস্ত ছিল এটি।

এই অর্থ প্রিন্সেস হায়ার ব্রিটিশ প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং তার ও তার সন্তানদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা খরচ বাবদ ব্যয় হবে। তিনি আগে যেই বিলাসী জীবন-যাপন করতেন সেই হিসেবেই তাকে এই অর্থ দিতে বলা হয়েছে দুবাই শাসককে।

এখানে রইল এই রাজকীয় দম্পতির জীবনযাত্রার বিশদ বিবরণ যা এই রায়ে তালিকাভুক্ত ছিল:

দুবাইতে ‘সীমাহীন’ টাকা

বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং দুবাইয়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাকতুম ২০০৪ সালে রাজকুমারী হায়াকে বিয়ে করেছিলেন। রায়ে বলা হয়েছে যে, রাজকুমারী হায়া তার অজান্তেই শরিয়া আইনের অধীনে ২০১৯ সালে তাকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন। এক দেহরক্ষীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কের জেরে তার এই বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটে যায়। ওই দেহরক্ষী ছিলেন সাবেক এক ব্রিটিশ সেনা।

রাজকুমারীর আইনজীবীরা আদালতকে বলেন যে, দুবাইতে থাকাকালীন তার এবং তার বাচ্চাদের ‘সীমাহীন’ অর্থে প্রবেশাধিকার ছিল।

রাজকুমারী হায়ার এক ডজনেরও বেশি বিলাসবহুল প্রাসাদে প্রবেশাধিকার ছিল। ছিল একটি ৪০০ মিলিয়ন পাউন্ডের ইয়ট এবং একটি ব্যক্তিগত বিমানের বহর।

রায় অনুসারে, তিনি তার পরিবারের জন্য বার্ষিক ৮৩ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা) পেতেন এবং আরও ৯ মিলিয়ন পাউন্ড হাত খরচের জন ব্যয় করতেন।

 

শিশুদের টাকা ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল মোকাবিলা

শুনানির সময় রাজকুমারী হায়াকে একজন দেহরক্ষীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ঢাকতে ৬.৭ মিলিয়ন পাউন্ডের (প্রায় ৮০ কোটি টাকা) অর্থ প্রদান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। সেই অর্থপ্রদান করতে, তিনি শিশুদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ ব্যবহার করেছিলেন।

কেন তিনি বাচ্চাদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা নিয়েছেন এই প্রশ্নের উত্তরে হায়া বলেন, ‘আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম এবং এছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না’।

 

লন্ডনে রাজপ্রাসাদ

বিয়েবিচ্ছেদ থেকে পাওয়া ৫৫০ মিলিয়নের মধ্যে ২৫১.৫ মিলিয়ন পাউন্ড লন্ডনে রাজকুমারী হায়ার বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যয় হবে।

২০১৬ সালে রাজকুমারী হায়া কেনসিংটন প্যালেসের কাছে ৮৭.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি প্রাসাদ কিনেছিলেন এবং তারপরে এটি সংস্কার করতে ১৪.৭ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করেছিলেন।

দুবাই শাসককে এই বাড়ির ১০ বছরের সংস্কার প্রকল্পের খরচ এবং পাঁচজন গৃহকর্মীর বেতনও দিতে বলা হয়েছে।

রাজকুমারী হায়া বার্কশায়ারে তার ক্যাসলউড ম্যানশনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও বছরে ৭ লাখ ৭০ হাজার পাউন্ড চেয়েছেন।

 

৪০০ রেসের ঘোড়া

রাজকুমারী হায়া বলেন যে, তিনি এবং তার সন্তানরা ৬০টিরও বেশি ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার মালিক, যার জন্য তিনি ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলেন। শেখের সঙ্গে বিবাহিত হওয়ার সময় তিনি প্রায় ৪০০টি ঘোড়দৌড়ের ঘোড়া কিনেছিলেন।

 

ছুটির দিন এবং অবসর

তার বিয়ের সময় তার পরিবার ইতালিতে এক গ্রীষ্মের ছুটিতে ৬ লাখ ৩১ হাজার (প্রায় ৭ কোটি) পাউন্ড ব্যয় করেছিল এবং অন্য একটি অনুষ্ঠানে গ্রীসের একটি হোটেলের বিল ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার ইউরো।

রাজকুমারী হায়া ব্রিটেনে দুই সপ্তাহের ছুটি কাটাতে এবং প্রতি বছর নয় সপ্তাহ ধরে বিদেশ ভ্রমণের জন্য প্রচুর অর্থ পেতেন।

বিচারক ফিলিপ মুর বলেছেন যে, রাজকুমারী ছুটির জন্য বার্ষিক ৫.১ মিলিয়ন পাউন্ড, ব্যক্তিগত বিমান ভাড়া এবং খাদ্যের জন্য ১০ লাখ পাউন্ড করে পাবেন।

আদালত রাজকুমারী হায়াকে অবসর কাটানোর জন্য আরও ১ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়েছে। এছাড়াও তিনি পোষা প্রাণীর পেছনে খরচ করার জন্য বছরে ২৭৭০৫০ পাউন্ড মঞ্জুর করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ২৫ হাজার পাউন্ড ঘোড়া কেনার জন্য এবং ১২ হাজার পাউন্ড খেলনা, সাজসজ্জা এবং অনির্দিষ্ট প্রাণীদের প্রশিক্ষণের জন্য।

 

জামাকাপড় এবং গহনা

রাজকুমারী হায়া তার সাক্ষ্যে বলেছেন যে, তার প্রাক্তন স্বামী তাদের বিয়ের সময় তাকে নিয়মিতভাবে অসাধারণ সব উপহার দিতেন। গয়না এবং পোশাক হারিয়ে যাওয়ার দাবিতে তাকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে ১৩.৭ মিলিয়ন পাউন্ড দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি হারিয়ে যাওয়া আইটেমগুলোর জন্য প্রাথমিকভাবে ৫২ মিলিয়ন পাউন্ড চেয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন যে, তার বিলাসবহুল পোশাকের সংগ্রহের মূল্য প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ইউরো, এবং তিনি ব্রিটেনে পালিয়ে যাওয়ার পরে শুধুমাত্র সবচেয়ে মৌলিক জিনিসগুলো তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

রাজকুমারী হায়া মামলায় তার সাবেক স্বামীর কাছ থেকে ১.৪ বিলিয়ন পাউন্ড দাবি করেছিলেন। কিন্তু তাকে দেওয়া হয়েছে ৫৫০ মিলিয়ন পাউন্ড।

এই অর্থের মধ্যে ২০৬৮ সাল পর্যন্ত রাজকুমারী হায়া ও তার সন্তানদের নিরাপত্তার খরচও রয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে রাজকুমারী হায়া (৪৭) এবং তার স্বামী দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাকতুম (৭৩) উভয়েই মারা যাবেন।

 

প্রসঙ্গত, রাজকুমারী হায়া যেই ব্রিটিশ সেনার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি ব্রিটেনের রাজকুমারীর দেহরক্ষী হিসেবেও কাজ করেছেন পাঁচ বছর। রাসেল ফ্লাওয়ার নামের ওই ব্রিটিশ সেনা ব্রিটেনের প্রিন্সেস অফ ওয়েলস র‍য়াল রেজিমেন্টে ওই পাঁচ বছর কাজ করেছেন।

রাসেল ফ্লাওয়ার ২০১৬ সালে রাজকুমারী হায়ার দেহরক্ষী হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং রাজকুমারীর অনেকগুলো বিদেশ সফরে সঙ্গী হয়েছিলেন। যুক্তরাজ্যের সাফোল্কে দুবাই শাসকের ৩,০০০ একরের রাজপ্রাসাদে রাজকুমারী হায়ার নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে থাকার সময় প্রথম রাসেল রাজকুমারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন।

বিদেশ ভ্রমণের সময় তারা পাশাপাশি ঘরে থাকতেন। তবে রাসেল ফ্লাওয়ারস এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। কারণ তিনি রাজকুমারীর সঙ্গে এসব বিষয় প্রকাশ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এই সম্পর্ক রাজকুমারীর ১৬ বছরের বিবাহের সমাপ্তি ঘটায় এবং তার শয়নকক্ষে একটি গুলিভরা বন্দুক রেখে যাওয়ার পরে তিনি প্রাণভয়ে পালাতে বাধ্য হন। তাকে বলা হয়েছিল একটি হেলিকপ্টার রাজপ্রাসাদে অবতরণ করবে এবং তাকে কারাগারে নিয়ে যাবে।

 

প্রিন্সেস হায়া তার এক দেহরক্ষী সাবেক ব্রিটিশ সেনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন বলে জানার পর শেখ মোহাম্মদ ‘তুমি বেঁচে ছিলে, তুমি মরে গেছো’ নামে একটি কবিতা প্রকাশ করেন, যাতে তাকে হুমকি দেয়া হয় বলে অনুমান করা হয়। তিনি বলেন, ব্রিটেনে আসার পরও তিনি হুমকি পেয়েছেন। তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তুমি যেখানেই থাকো না কেন সেখানে আমাদের যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।