জ্বলন্ত লঞ্চ থেকে ঠান্ডা পানিতে ঝাঁপ দেয় ‘দেড়-দু শ যাত্রী’

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে গভীর রাতে অগ্নিকাণ্ডের পর দেড়-দু’শ যাত্রী নদীতে ঝাঁপ দেন। তাদের বেশির ভাগই তীরে উঠতে পারেনি বলে ওই লঞ্চের বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা দাবি করেন।

লঞ্চে আগুন লাগার ঘটনায় দগ্ধ হয়ে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। জীবন বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপ দিলে তীব্র শীত ও আহত হয়ে আরো নয়জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দগ্ধ হয়েছে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৮০ জন।

আহতদের বেশির ভাগকে বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর সাতজনকে ঢাকা শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা বলেন, লঞ্চটিতে যাত্রী ধারণক্ষমতা ছিল চার শ। তবে যাত্রী তোলা হয় আরো বেশি। আগুন লাগার পর দেড়-দু’শ যাত্রী নদীতে ঝাঁপ দেন। পানি ঠান্ডা থাকায় আর আবহাওয়ার কারণে তাদের অনেকে তীরে উঠতে পারেনি।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা থেকে পাঁচ শতাধিক যাত্রী নিয়ে বরগুনা যাচ্ছিল এমভি অভিযান-১০ যাত্রীবাহী লঞ্চটি। বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে ইঞ্জিন কক্ষে বিকট বিস্ফোরণ ঘটে আগুন লাগে যায়। এ সময় কেবিন ও ডেকের বেশির ভাগ যাত্রী ঘুমিয়ে ছিলেন।

বেঁচে যাওয়া যাত্রী বামনা উপজেলার আবদুল্লাহ বলেন, আগুন দেখে নিচতলার ডেকের যাত্রীরা দোতলায় আশ্রয় নেয়। এ সময় লঞ্চের কর্মচারীরা কেবিনের যাত্রীদের কেবিন থেকে বের হতে নিষেধ করেন।

আবদুল্লাহ আরো বলেন, আগুন লাগার পরও লঞ্চটি প্রায় ৩০/৪০ মিনিট চালিয়ে প্রথমে ঝালকাঠির বিষখালী-সুগন্ধা-ধানসিঁড়ি নদীর মোহনায় মোল্লাবাড়ি সরই মাজার এলাকায় থামিয়ে দেয়। পরে সেখান থেকে লঞ্চের কর্মচারী ও অধিকাংশ যাত্রী নেমে যেতে সক্ষম হলেও কেবিন ও ডেকের ঘুমন্ত যাত্রীরা আর নামতে পারেনি।

অপর যাত্রী বাচ্চু মিয়া বলেন, সরই এলাকায় অনেক যাত্রী যখন নেমে যায় তখন লঞ্চে আগুনের পরিমাণ কম ছিল। সেখান থেকে লঞ্চটি ভাসতে ভাসতে ঝালকাঠির দিয়াকুল গ্রামে সুগন্ধা নদীর তীরে আটকে যায়। সেখানে বেশ কিছু যাত্রীকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা। অনেকে লঞ্চ থেকে লাফিয়ে নদীতে পড়েন। ভোর পাঁচটার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে।

লঞ্চের বেঁচে যাওয়া আহত যাত্রী বরগুনা জেলার তালতলি উপজেলার সনিয়া বেগম বলেন, আগুন দেখে আমি আমার ১১ মাসের শিশুপুত্র জুবায়েরকে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষত হই। তবে আমার মা রেখা বেগম ( ৪০) ও ছেলে জুনায়েদ (৫) এখনও নিখোজ রয়েছে।

প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, উদ্ধার ৩৯ লাশের মধ্যে পাঁচজনের লাশ শনাক্ত করা গেছে। লাশগুলো ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। সব লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে ।

বিকেলে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

তিনি বলেন, একটি লঞ্চে আগুন লেগে পুরো লঞ্চ ভস্মিভূত হওয়ার পেছনে কোনো রহস্য থাকতে পারে। এভাবে কোনো ঘটনা বাংলাদেশে আর ঘটেনি। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে একজন যুগ্মসচিবকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি জানান, নিহত প্রত্যেক পরিবারকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। আগামী সাত দিনের মধ্যে কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। এ ঘটনায় যদি কারও গাফেলতি থেকে থাকে তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ সময় ডিআইজি মো. আক্তারুজ্জামান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সরদার মো. শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক খান সাইফুল্লাহ পনিরসহ নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

বিআইডব্লিউটিসি,  ফায়ার সার্ভিস, নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড পৃথকভাবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।