দুই বছর ধরে বন্ধ বার্ন ইউনিট

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকায় প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ। এতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের অগ্নিদগ্ধ রোগীদের। দগ্ধ রোগীরা হাসপাতালে এলে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয় সার্জারি ওয়ার্ডে। গুরুতর রোগীদের পাঠানো হয় ঢাকায়। সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থাকা সত্বেও কেবল চিকিৎসক না থাকায় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগীর স্বজনরা।

সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার ঝালকাঠিতে ‘এমভি অভিযান-১০’ লঞ্চে অগ্নিকা-ে দগ্ধ ৭০ রোগীকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদেরকে হাসপাতালের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পঞ্চম তলার সার্জারি বিভাগে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সার্জারি বিভগের চিকিৎসকরা বলছেন, ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পুড়ে গেলে সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসা সম্ভব। এর বেশি দগ্ধ হলে বার্ন ইউনিট প্রয়োজন। এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকা-ে যেসব রোগী এখন পর্যন্ত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ রোগীর শরীরের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। এসব রোগীর চিকিৎসায় বার্ন ইউনিটের প্রয়োজন। কিন্তু শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটটি বন্ধ রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১২ মার্চ হাসপাতালের নিচতলায় সহকারী অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে আটটি শয্যা নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের। বছরখানেক পর ডা. হাবিবুর রহমান অবসরে গেলে তার স্থলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে বদলি হয়ে আসেন সহযোগী অধ্যাপক শাখাওয়াত হোসেন। কিন্তু তিনি এখানে যোগদান করেননি। পরে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. একেএম আজাদ সজল এই ইউনিটটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ডা. একেএম আজাদ ১৬ জন নার্স নিয়ে আট শয্যা থেকে বার্ন ইউনিটকে ৩০ শয্যায় উন্নীত করেন। কিন্তু ২০২০ সালের ২৮ এপ্রিল ডা. একেএম আজাদ বরিশাল নগরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকের লিফটে রহস্যজনকভাবে মারা যান। তার মৃত্যুর পর থেকেই শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

বরগুনা জেলার পাথরঘাটা থেকে আসা দগ্ধ রোগী দুলু বেগমের ছেলে মাইদুল বলেন, এতবড় একটি হাসপাতালে বার্ন ইউনিট নেই তা কীভাবে হয়। সরকার স্বাস্থ্যখাতে এত টাকা বরাদ্দ দেয় তা কোথায় যায়। শুনেছি বার্ন ইউনিটে কোনো ডাক্তার নেই। এত বছরেও কোনো ডাক্তার কীভাবে নিয়োগ না দিয়ে ওয়ার্ডটি ফেলে রাখা হয়েছে। আজ যদি ওয়ার্ডটি চালু থাকত তবে আমাদের ঢাকা যেতে হতো না।

দগ্ধ সেলিম রেজার স্বজন হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদের যদি ঢাকা পাঠানোই হয় তবে বরিশালে না এনে একেবারে ঢাকা পাঠিয়ে দিত। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে রওনা হয়েছেন। টাকারও একটা বিষয় আছে। এভাবে আর কদিন চলবে।

মাহফুজ আলম নামের এক রোগীর স্বজন বলেন, শের-ই-বাংলা মেডিকেলে আগুনে পোড়া রোগীর চিকিৎসা হয় না এটা আমার জানা ছিল না। হাসপাতাল প্রশাসন এতদিনে কোনো ডাক্তার পায়নি। আমাদের রোগীর কিছু হলে এর দায়ভার তো তাদেরই নিতে হবে।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাজিমুল আহসান বলেন, এই হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে কোনো চিকিৎসক নেই। ওই ইউনিটটি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই সার্জারি বিভাগ দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছে। তবে জরুরি ভিত্তিতে ওই ইউনিটে চিকিৎসক পদায়ন দিয়ে ইউনিটটি চালু করা প্রয়োজন।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, অগ্নিদগ্ধ যেসব রোগী আসছেন তাদের সার্জারি ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর অবস্থা গুরুতর দেখলে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বার্ন ইউনিটটি চালু করার জন্য মন্ত্রণালয়ে অন্তত একজন চিকিৎসকের জন্য বারবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে কোনো উত্তর আসেনি। তবে বর্তমান সরকার বরিশালে ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্যোগ অনুযায়ী কাজও চলছে।