গাজীপুরে কর্মীদের একের পর এক হামলার শিকার হচ্ছেন আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা। মূলত গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাময়িক বরখাস্ত মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলমের অনুসারী এবং সুপারিশে ব্যবসা-বাণিজ্য করাদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। সবশেষ গত ২১ ডিসেম্বর গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান এস এম মোকছেদ আলম এবং টঙ্গীর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. রজব আলীকে দলের কর্মীরা লাঞ্ছিত করেছেন।
এরপর নগরীতে এক সময় জাহাঙ্গীর আলমের ঘনিষ্ঠ, তার সঙ্গে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে গুটিয়ে রেখে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছেন।
গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জাহাঙ্গীর আলম মহানগর আওয়ামী লীগের ৫৭টি ওয়ার্ডের প্রায় সবক’টিতে কমিটি দিয়েছেন। আটটি থানা কমিটিও তার করা। এসব কমিটির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে এখন জাহাঙ্গীরের দালাল আখ্যা দিয়ে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। দিন শেষে এতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিরই ক্ষতি হচ্ছে।’
জাহাঙ্গীর বিরোধীরা চড়াও হওয়ায় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা গা ঢাকা দিয়েছেন। বড় একটি অংশ ঘরবন্দি। অনেককে মেরে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বাড়িঘরে হামলা ছাড়াও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করা হচ্ছে। গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগে পেশিশক্তির মহড়ায় শৃঙ্খলা একেবারে ভেঙে পড়েছে বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ নেতারা। তারা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ায় কর্মসূচি বাস্তবায়নে তার সঙ্গে থাকতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেও শুধু জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কর্মসূচিতে থাকায় তাদের এখন লাঞ্ছনা, হামলা-মামলার শিকার হতে হচ্ছে।
গত ১ ডিসেম্বর গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আনোয়ারুল কবির জুয়েলের মোটরসাইকেল থামিয়ে নগরীর মৈরান ব্রিজের কাছে মারধর করা হয়। এতে তার দুই পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। এরপর ভাওয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সমাজকল্যাণ সম্পাদক বিকাশ সরকারকে গাজীপুর চৌরাস্তায় মারধর করা হয়। গত ২৪ নভেম্বর নগরীর কাউলতিয়া সাংগঠনিক থানা যুবলীগের সভাপতি প্রার্থী মতিউর রহমান মতিনের জোলারপাড়ের বাড়িতে হামলা হয়। হামলাকারীরা লুটপাটও করে। গত ২১ নভেম্বর নগরীর ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য সচিব আবুল হোসেনের ওপর হামলা হয়। ২৩ নভেম্বর ৫৪ নম্বর আওয়ামী লীগ সদস্য সৈকত পাঠানকে মারধর করা হয়। হামলার শিকার হয়েছেন কোনাবাড়ীর আওয়ামী লীগ নেতা আনিস মাস্টারও।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদ ও উপদেষ্টা পরিষদের সভা চলাকালে টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. রজব আলী এবং সভা শেষে গাড়িতে ওঠার সময় মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান এসএম মোকছেদুর রহমানকে মারধর করা হয়।
বর্তমানে জাহাঙ্গীর আলমের ঘনিষ্ঠ শতাধিক নেতা ও কাউন্সিলর চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কাউন্সিলর জানান, দলের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র থাকার কারণে তারা জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখেন। এখন তিনি দলে নেই, মেয়রও নন। কোনো সম্পর্কও নেই। তারপরও নানা হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।
গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে কেউ হামলার শিকার হয়েছেন বলে আমার মনে হয় না। ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তারপরও আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখব।’