গৃহশ্রমিক সুরক্ষা ও কল্যাণ কি কেবল কেতাবে

বিশ্বনন্দিত ব্যক্তিরা ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন আজীবন। তবু আজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ প্রথা প্রচলিত রয়েছে ভিন্নরূপে। অনেকের ধারণা প্রাচীন দাস-এর আধুনিক পরিবর্তিত সংস্কার গৃহপরিচারিকা বা সাধারণভাবে ‘বুয়া’ নামের চরিত্র। আজকের নগর জীবনে নগরবাসীর গৃহস্থালির কাজকর্ম বুয়া ছাড়া অচল। 

এই বুয়ারা প্রায়ই পত্রিকার সচিত্র সংবাদ শিরোনাম হয়ে ওঠে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে দেখা যায় গৃহকর্মী (বুয়া) নির্যাতনের নির্মম ঘটনা। অথচ গৃহকর্মীরা আমাদের পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যাদের ছাড়া একদিনও চলে না তাদের ওপরেই খড়গ। বাথরুমে আটকে রাখা, হাত-পা ভেঙে দেওয়া, গরম পানি শরীরে ঢেলে দেওয়া, বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে চেপে ধরে পুড়িয়ে দেওয়া। সামান্য ত্রুটি হলেই চড়-থাপ্পড় থেকে শুরু করে খুন্তির ছ্যাঁকা, বেলন-লাঠির পিটুনি ছুরি-ব্লেডের আঁচড় দেওয়াসহ নানাভাবে গৃহকর্মীদের নির্যাতন করা হয়। এর পাশাপাশি ঠিকমতো খাবার না দেওয়া, বেতন না দেওয়া বা কম বেতন দেওয়া, বাড়িতে যেতে না দেওয়ার অভিযোগও আছে। অনেক বুয়াদেরই কাজের নির্ধারিত কোনো কর্মঘণ্টা নেই। অনেক গৃহকর্মীর কাজ শুরু হয় ভোরে। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এর মধ্যে কোনো বিরতি নেই। সাপ্তাহিক ছুটি বা অবসর নেই। এমনকি ঘুমানোর কোনো নির্দিষ্ট স্থানও নেই। সময়ও নেই। কোনো কোনো হাইরাইজ ফ্ল্যাটবাড়িতে বুয়াদের লিফট ব্যবহারের অনুমতি পর্যন্ত নেই। এখনো অনেক ক্ষেত্রে বুয়া নিয়োগ হয় পেটে-ভাতে। বুয়াদের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করা হয়। যেন গৃহপালিত জন্তু। তাদের ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু থাকে না। স্বামী-স্ত্রী বা বউ-শাশুড়ি পালাক্রমে নির্যাতন করে গৃহকর্মীকে। সহযোগী শক্তি হিসেবে যোগ দেয় পরিবারের অন্য সদস্যরাও। অনেক ক্ষেত্রেই এমন নির্যাতনের ঘটনায় গৃহকর্মীরা হত্যা, ধর্ষণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এমন সংবাদ গণমাধ্যমে আসে। অন্যদিকে এমন বেশিরভাগ নির্যাতনের কোনো বিচার পান না গৃহকর্মীরা। মামলা হয় খুব কম ঘটনাতেই। আবার হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আপস হয়ে যায়। গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনের নেতারা বলছেন, প্রতিদিন কত গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে নির্যাতনের প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনা নানাভাবে চাপা পড়ে যায়। আর এমন সব নির্যাতনে বছরে গড়ে মারা যায় ৩০ জন। শুধু হত্যাকান্ড বা মুমূর্ষু অবস্থায় কোনো গৃহকর্মী হাসপাতালে ভর্তি হলেই কেবল সেই ঘটনা প্রকাশ পায়। নির্যাতনকারীদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার করা হলেও আইনের ফাঁক গলে কিংবা ক্ষমতা ও অর্থের দাপটে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।

দেশের এই বিপুল সংখ্যক গৃহকর্মীর সার্বিক কল্যাণ ও গৃহকর্মকে ‘শ্রম’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর ‘গৃহশ্রমিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১৫’ এর খসড়া অনুমোদন করা হয়। এই নীতিমালায় গৃহপরিচারিকাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী ১২ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিশোর-কিশোরীদের গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দিতে হলে নিয়োগের চুক্তি, মজুরি নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, কর্মঘণ্টা, ছুটি, বিশ্রাম, সুষ্ঠু ও মর্যাদাসম্পন্ন কাজের পরিবেশ, বিনোদন, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা, ধর্মপালনের সুযোগ ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। শ্রম আইন অনুযায়ী গৃহকর্মীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম গৃহশ্রমিকদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তৈরি করল। এখন থেকে গৃহকর্মীদের বেতনের হিসাবও বার্ষিক আয়কর বিবরণীতেও দেখাতে হবে।

এই নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মীকে নিয়োগ করতে হলে আলোচনা, সমঝোতা ঐকমত্যের পর তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে আলোচনা বাঞ্ছনীয়। গৃহকর্মীদের শ্রমঘণ্টা এবং বেতন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করতে হবে। নীতিমালায় গৃহকর্মীদের বিশ্রামের পাশাপাশি বিনোদনের সময় দেওয়ারও নির্দেশনা রয়েছে। গৃহশ্রমিক নিয়োগের চুক্তিতে আটটি বিষয় উল্লেখ করতে হবে। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়োগের ধরন, তারিখ, মজুরি, বিশ্রামের সময় ও ছুটি, কাজের ধরন, গৃহকর্মীর থাকা খাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ ও শরীরিক পরিচ্ছন্নতা এবং গৃহকর্মীর বাধ্যবাধকতা। এই নীতি ভঙ্গ হলে বা কোনো নির্যাতনের শিকার হলে গৃহশ্রমিকরা সরকারের মনিটরিং সেলে মৌখিক বা লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন-২০০৬ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল থেকে গৃহশ্রমিকদের যৌক্তিক সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকার উদ্যোগ নেবে বলেও ওই নীতিমালায় উল্লেখ আছে। গৃহকর্মী যদি নিয়োগকারী পরিবারের শিশু, অসুস্থ ও বৃদ্ধ ব্যক্তিসহ কোনো সদস্যের সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বা পীড়াদায়ক আচরণ করেন, তবে নিয়োগকারী তার নিয়োগ বাতিল করে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবেন। কাউকে না জানিয়ে গৃহকর্মী চলে গেলে নিয়োগকারী সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করতে পারবেন। অন্যদিকে, অর্থ বা মালামাল নিয়ে গৃহকর্মী চলে গেলে সে ক্ষেত্রে আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন নিয়োগকারী। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান অনুসারে দেশে রয়েছে প্রায় ২০ লাখ গৃহকর্মী। এদের ৮০ ভাগই মেয়ে শিশু। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (আইএলও) ও ইউনিসেফের এক জরিপে এ তথ্য জানা গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৪ সালের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী গৃহকর্মে নিয়োজিত ১ লাখ ২৫ হাজার শিশুকর্মীর বয়স ৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ মেয়ে শিশু। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় ২৩, ২৪ ও ২৫ অনুচ্ছেদে মানবাধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সব কর্মী ও শ্রমিকের সমান মজুরি, বিশ্রাম, অবসর, যুক্তিযুক্ত কর্মঘণ্টাসহ শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার্থে সব অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অন্য শ্রমিকদের জন্য যে সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে গৃহশ্রমিকদের জন্য তা নেই। কিন্তু গৃহকর্মীরা আনুষ্ঠানিক খাতের ‘শ্রমজীবী’ না হওয়ার ফলে তাদের পোহাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত নানাবিধ দুর্ভোগ।

বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ, বিলস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৭৪ জন গৃহকর্মী নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। বিলস-এর সংবাদপত্র জরিপ অনুয়ায়ী ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত প্রায় ২২ জন গৃহশ্রমিক হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৩৮ জন নারী গৃহকর্মীর ওপর সহিংসতার কথা জানিয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ জন নিহত আর তিনজন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০২০ সালে সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৪৫ জন ও হত্যার শিকার হয়েছেন ১৩ জন। ধর্ষণের শিকার ৮ জন। দেশের গৃহশ্রমিকরা এখনো চরমভাবে নির্যাতিত। বেড়ে চলেছে তাদের ওপর নৃশংস সব হত্যাকান্ড ও নির্যাতনের ঘটনা। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা বলছেন, নীতিমালাটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশজুড়ে এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে চলেছে। মানা হচ্ছে না গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি। গৃহকর্মীরা যদি তাদের অধিকারের সম্পর্কে না জানে, সচেতন না হয় তা হলে সুরক্ষা আইন খালি কিতাবেই থাকবে। বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না। শুধু আইন করলেই নির্যাতন বন্ধ হবে না। নীতিমালা দিয়েও শ্রমিকের সুরক্ষা হবে না যদি না নিয়োগকারী পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে সচেতন ও আন্তরিক না হন। অবশ্যই এক্ষেত্রে নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার জনপরিসরে সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হবে। পদে পদে গৃহশ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। গৃহশ্রমিকরা সমাজের প্রান্তিক মানুষ। তাদের শ্রমের দাম নিয়ে কথা হয় কম। কারণ তাদের শ্রমের কোনো স্বীকৃতি নেই। তাদের জন্য মানবিক উদ্বেগ ও উদ্যোগ নেই। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল গঠিত হয়। বেতন স্কেল নিয়ে হৈচৈ হয়। বেতন স্কেলের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-ব্যাসার্ধ নিয়ে আলোচনা চলে বছরব্যাপী। ক্ষমতার পালাবদলে শ্রমিকের মজুরিও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু গৃহকর্মী বা বুয়াদের পে-স্কেল কখনোই গঠিত হয় না। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়েও কি এই বাস্তবতাই চলতে থাকবে?

লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট

hindol_khan@yahoo.com