খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) লালন শাহ হলের প্রাধ্যক্ষ মো. সেলিম হোসেনের (৩৮) মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত ৪৪ জন শিক্ষার্থীকে শোকজ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার এই নোটিশ দেয়া হয়। আগামী ৩ জানুয়ারির মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে ছাত্রদের।
কুয়েটের পাবলিক রিলেশন অফিসার মো. রবিউল ইসলাম শোকজ প্রদানের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আজই ছাত্রদের কাছে শোকজের চিঠি দেয়া হয়েছে। ৩ জানুয়ারির মধ্যে তাদেরকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
তাদের জবাব পাওয়ার পর তা যাবে শৃঙ্খলা কমিটিতে। সেখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে উত্থাপন করা হবে।
গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্রে তদন্ত প্রতিবেদনটির ব্যাপারে বেশ কিছু তথ্য জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অধ্যাপক মো. সেলিমের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা যে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ওই ঘটনায় জড়িত ৪৪ জন শিক্ষার্থীর ভূমিকা আলাদা করে ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনায় তারা সরাসরি যুক্ত, এমনটা প্রমাণ করা যায়নি।
তবে তাকে যে মানসিক নিপীড়ন করা হয়েছিল, তা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তদন্ত কমিটি শাস্তির কোনো সুপারিশ করেনি। বিষয়টা তারা প্রশাসনের হাতে ছেড়ে দিয়েছে।
কুয়েট ছাত্র শৃঙ্খলা কমিটির সদস্যসচিব ও ছাত্রকল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক ইসমাঈল সাইফুল্যাহ বলেন, ঘটনায় যাদের নাম এসেছে, আমরা তাদের শোকজ নোটিশ পাঠাচ্ছি। উত্তর দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। উত্তরগুলো পাওয়ার পরই শৃঙ্খলা কমিটির সভা হবে। সেখানে বিষয়গুলো উত্থাপন করা হবে।
শাস্তি পাওয়া বা না পাওয়ার বিষয়ে ওই সভায় সিদ্ধান্ত হবে। ক্যাম্পাস খোলার আগেই এই প্রক্রিয়া শেষ হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হয়তো সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, তবে ওই শিক্ষক হল সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মানসিক চাপে ছিলেন।
তদন্তের সময় কমিটি ৬৫ জন শিক্ষার্থী, ৪০ জন শিক্ষকসহ প্রায় ১৪০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে। পাশাপাশি অধ্যাপক সেলিম মারা যাওয়ার দিনের ঘটনা ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছে কমিটি।
তদন্ত কমিটির প্রধান মহিউদ্দিন আহমাদ বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্তভাবে তারা তদন্ত করেছেন। প্রতিবেদনে ওই ঘটনায় পর্যবেক্ষণসহ নয়টি সুপারিশ করা হয়।
সূত্র জানায়, কমিটি যেসব সুপারিশ করেছে, সেখানে ছাত্ররাজনীতি একেবারে বন্ধ করার কথা বলা হয়নি। তবে কিছুদিনের জন্য ক্যাম্পাসে ছাত্রদের রাজনীতি কর্মকাণ্ড স্থগিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানার পর তারা এ ব্যাপারে কথা বলবেন।
গত ৩০ নভেম্বর ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক ও লালন শাহ হলের প্রাধ্যক্ষ সেলিম হোসেন ক্যাম্পাসের কাছের ভাড়া বাসায় মারা যান।
অভিযোগ ওঠে, মৃত্যুর দিন দুপুরে বাসায় ফেরার পথে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা অধ্যাপক সেলিমকে বিভাগে তার কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তার ওপর মানসিক নিপীড়ন চালানো হয়। এর আগেও হলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার ওপর মানসিক চাপ দেওয়া হচ্ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বলছে, এটি হত্যাকাণ্ড। অধ্যাপক সেলিমের পরিবারও এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছে।
প্রফেসর ড. মো. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর পর উত্তপ্ত হয়ে উঠে ক্যাম্পাস। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে গত ৩ ডিসেম্বর জরুরি সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানসহ ৯ জন ছাত্রকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।