গল্পটা শুনেছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে এক বন্ধুর মুখে। মেদিনীপুর সদরে জেলা শাসকের ঘরে এক তরুণ আধিকারিক গেছেন। তরুণটির সেদিন অফিসে জয়েন করার কথা। জেলা শাসক কাগজপত্র দেখবেন আগে। কিন্তু ডিএম এমন ব্যস্ত যে ফাইল দেখতে দেখতে বেচারা তরুণটির দিকে ফিরেও দেখছেন না। ছেলেটি কিছু সময় বাদে সামান্য অধৈর্য হয়ে গলা খাঁকারি দিতে খানিকটা আড় চোখে তরুণটিকে রাশভারী ডিএম আদেশ করলেন, যাও আগে ঘোড়ার সঙ্গে দেখা করে এসো। ছেলেটি নির্বিকার দাঁড়িয়ে। এবার স্বয়ং জেলাশাসক ইষৎ অসন্তুষ্টি নিয়ে বল্লেন, কি হলো ঘোড়ার কাছে গিয়ে কথা বলুন। এবার নিরূপায় তরুণটি বলে বসল, স্যার তাহলে আর এ চাকরি আমার হলোনা! ডিএম অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেন? তরুণ আমতা আমতা করে জানাল, স্যার ইংরেজি জানি, হিন্দিও বলতে পারি, বাংলা তো আমার ভাষাই। কিন্তু ঘোড়ার সঙ্গে কথা বলার ভাষা আমি জানি না। হো হো করে এবার হেসে উঠলেন দাপুটে জেলা শাসক। ওরে ইয়ং ম্যান এ ঘোড়া সে ঘোড়া নয়। এ আমাদের বলাই চাঁদ ঘোড়া। আমাদের হেড ক্লার্ক। ও তোমাকে কাজ বুঝিয়ে দেবে।
পার, ঘোড়া, কপাট, পোদ, এরকম অজস্র বিচিত্র পদবী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেদিনীপুরের সর্বত্র। কিন্তু মুর্শিদাবাদ এবার আমাকে চমকে দিয়েছে নতুন নতুন নাম শুনিয়ে। এর আগে কতবার নবাবের শহরে এসেছি। কিন্তু কখনো এমন সব বাহারি নাম শোনার সৌভাগ্য হয়নি। ‘সিপিএম শেখ’ যেমন আছে, তেমনি পাবেন ‘কংগ্রেস আলী’ বা ‘বিজেপি ম-ল’। এসব যদি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে হয়, তাহলে ঔপনিবেশিক ভারতকেও আবিষ্কার করবেন এখনও জনপ্রিয় ‘বৃটিশ শেখ’ ও ‘ইংরেজ রহমান’-এর নামের মধ্যে।
ইতিহাস আর জনজীবনের টানে বারেবারে এখানে ফিরে আসি। টানা একমাস শরীরের কারণে গৃহবন্দী আমি একটু সুস্থ হতেই দে ছুট, দে ছুট। পলাশী এলেই কেমন বিষণœ লাগে। স্মৃতি ছাড়া এখন আর কোথাও সেদিনের কোনো চিহ্ন মাত্র নেই। গঙ্গায় চলে গেছে ‘ব্যাটল অফ পলাশী’র যাবতীয় স্মারক। থেকে গেছে শুধু বিষাদ আর হাহাকার। ১৭৫৭ সালের এই পলাশীর প্রান্তরেই অস্ত গেছিল ভারতের স্বাধীনতার সূর্য। বছরের শেষে একদা সুবে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের গাঁ-গঞ্জে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কয়েক বছর আগে খুঁজে বের করেছিলাম আলী রেজা সাহেবকে। তিনি আক্ষরিক অর্থেই মীরজাফরের বংশধর। মীরণের সপ্তম পুরুষ। ঢাউস একটা কেতাব লিখে ফেলেছেন মীরজাফর খুব কিছু অপরাধ করেননি এটা প্রমাণ করতে। মীরণের সপ্তম পুরুষ বাসায় তখন লুঙ্গি পরে মুড়ি খাচ্ছিলেন। এমন সময় হানা দিলাম। সন্ধ্যা হয় হয়। চোখের সামনে ছাপোষা এক শিক্ষক আচমকা কেমন ঐতিহাসিক চরিত্র হয়ে উঠলেন। খানিক বাদে তাকে নিয়ে চল্লাম মীরজাফরের প্রাসাদে। লোকে বলে নফরৎকোঠী। কোনো ঘৃণা অবশ্য মানুষটাকে স্পর্শ করছে না।
নিমেষে আটপৌরে লোকটা কিভাবে যেন প্রাসাদের সামনে এসে নবাব হয়ে উঠলেন। শরীরের ভাষা আমুল বদলে গেছে। চোখের চাউনি, মুখের ভাষাও। হাঁকডাক করতে লাগলেন, কৈ হ্যায়! দরওয়াজা খুলো। নবাব আয়ে হ্যায়। নীরবে খুলে গেল বিরাট দরজা! ভেতরে ঢ়ুকতেই বিপুল ঝাড়লন্ঠন। আমরা তিন বন্ধু তখন পৌঁছে গেছি ১৭৫৭-তে। প্রাসাদের আধো আলো আর ছায়ায় ছায়ায় মনে হচ্ছেনিহত সিরাজের ক্ষতবিক্ষত শরীরের ওপর বসে আছেন জগত শেঠ, রায়দুর্লভ, মীরজাফর, মীরণ এবং লর্ড ক্লাইভ। তিনি তখনও লর্ড হননি। শুধুই রবার্ট ক্লাইভ। শরাবের সুবাস আর বাঈদের নাচের ছন্দ-সুর যেন শুনতে পাচ্ছি। ঘোর ভেঙ্গে এক বন্ধু ফিসফিসিয়ে জানতে চাইলে, সিরাজ উদ্দৌলাকে কতল করার ঘরটি দেখা যাবে! প্রাসাদের বাইরে এসে অনেক্ষণ চুপচাপ। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে রক্তাক্ত সিরাজকে ধরে নিয়ে আসছে তার নিমকখাওয়া একদল সিপাহী। লাল চোখে রেজা খান আমাদের দিকে তাকালেন। রাস্তার দুধারে লোকজন নীরবে দেখছে। প্রতিবাদ দূরে থাক, একজন চোখের জলটুকুও ফেলছে না। যতক্ষণ তুমি ক্ষমতায়, ততক্ষণ তোমার কদর। মোসাহেবদের ভিড়। সেকালের যা একালেও ছবি কিছু পাল্টায় নি।
বহরমপুর হয়ে লালগোলা যাচ্ছি বাসে। বছরের শেষ দিন। অবরোধে ট্রেন বন্ধ। লক্কড়ঝক্কড় বাস দুলকি চালে চলেছে। বাসের তাড়া নেই। আমাদেরও। আমাদের বলতে সঙ্গী বিশিষ্ট লেখক, বন্ধু মুর্শেদ এ এম। ম্ুের্শদের ‘জল জমিনের পদাতিক’ যে পড়েনি সে নিতান্তই অভাগা।
চালতিয়া বিল কখন পেছনে ফেলে এসেছি। হাজার দুয়ারী চলে গেল। এখন তোপখানা যাচ্ছে। একটু বাদে ভগবানগোলা। পালাতে গিয়ে সিরাজকে এখানেই ধরিয়ে দিয়েছিল দানশা ফকির। রাস্তা মাখনের মতো মসৃণ। দুপাশে বিপুল আমবাগান। এ তল্লাটে শর্ষের চাষ হয়েছে প্রচুর। আমার পাড়া বাসস্টপ এ বোরখা পরা এক তরুণী নামছেন। এদিকে কিন্তু এখনও বোরখা হিজাবের চল কম। কত কিছুই যে দেখার আছে। গোয়ালপাড়া স্কুলে গেলাম। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা ফুল দিল। চাষী বাসী পরিবারের মুসলমান ঘরের মেয়েরা স্বপ্ন দেখছে ডাক্তার, টিচার হবার।
পুরো নাম গোয়াসকালিকাপুর। বৃটিশ আমলে গোয়াস ছিল পরগনা। গোমানি নদীতে তখন প্রাণ ছিল। বাঁয়া পেরোলেই জিয়াগঞ্জ। উল্টো দিকে আজিমগঞ্জ। রাণী ভবাণীর রাজত্ব ছিল। নাটোর হয়ে এই আজিমগঞ্জ অবধি। এ দিকের তল্লাটে অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চাষের জমি কমছে। নগরায়ণের কল্যাণে। চাষের জমিতে এখন ইটভাটার ব্যাপক উপস্থিতি। একদা সমৃদ্ধ পাট চাষ আছে। কম।
মুর্শিদাবাদ গেলে সীমান্ত আমাকে টানে। ওপারে যে বাংলাদেশ, এপারেও সেই বাংলা। গোধনপাড়ায় গরু হাটের আর রমরমা নেই। গোয়াস, কাহার পাড়া, শেখপাড়া সর্বত্রই গো হাটার দিন গেছে। চাষের কাজে গরু আর অপরিহার্য নয়। তার জায়গা নিয়েছে প্রযুক্তি। ট্রাক্টর এসেছে। ধান ঝাড়াইমাড়াইও করে দিচ্ছে মেশিন। লালগোলা গিয়ে খান্ডুয়া যাব। ওপারে রাজশাহীর গোদাগাড়ী। সেখানেও গেছি। কিন্তু ভাসানী ভক্ত আমার প্রিয় শাহীন কবির আমাকে নিস্তব্ধ এক চরাচরে দাঁড় করিয়ে দিল। এ জায়গা কাহার পাড়ার হাড়–ডাঙ্গা। সামনে বিস্তৃত দুর্গাপুর চর।
কাঁটাতারের বেড়া। বিএসএফ-এর কড়া নজরে থামতে বাধ্য হলাম। বলে কয়ে সামনে যাবার অনুমতি মিলে গেল। ঠিক উল্টো দিকে রাজশাহী সদর। উঁচু উঁচু বাড়ি। ওপারে ‘অধ্যয়ন মামুন’কে ফোন করলাম। মামুন জানতে চাইছে, কি দেখছেন দাদা! এটা ওটা বলে পাশ কাটালাম। বলতে পারতাম, ১৯৪৭ সালে এক ভূখন্ড পেয়েছে অধিকার। আমরা দেশভাগের কথা বলি। অর্জন মনে রাখিনা। ওপারে স্ক্রাইস্ক্যাপার। এপারে বিষাদ।
শীতের দুপুরে খালি গায়ে বাচ্চা ছেলেরা খেলছে। এবড়ো খেবড়ো রাস্তা। চারপাশে অভাবের ছাপ স্পষ্ট। কাঁটাতারের দিকে তাকিয়ে আছি। মনে পড়ছে হাসান আজিজুল হক সখেদে বলেছিলেন, কাঁটাতার থাকলে কি আর বন্ধুত্ব হয়! বছরের শেষ দিনে আমার ওপারের বন্ধুদের জন্য মন খারাপ লাগছে। ভালো থাকুক সবাই। আমার চেনা অচেনা দুই বাংলার বন্ধুরা।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
dastidarsoumitra786@gmail.com