নোয়াখালীর হত্যা মামলা

বিচারিক আদালতে ‘খেয়ালের বশে’ গণহারে ফাঁসির রায়ে হাইকোর্টের উষ্মা

নোয়াখালীতে এক ব্যবসায়ী ও তার কর্মচারীকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় বিচারিক আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণের যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ না করে ‘খেয়ালের বশে’ গণহারে ফাঁসির রায় দিয়েছে বলে উষ্মা প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

উচ্চ আদালত ১৪ বছর আগের এই মামলায় বিচারিক আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে ৮ জনকে খালাস দিয়েছেন।

মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির পর সোমবার বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ও বিচারপতি জাহিদ সারওয়ারের বেঞ্চ এ রায় দিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন।

ফাঁসির দণ্ড থেকে খালাস পাওয়ারা হলেন- মোফাজ্জল হোসেন জাবেদ, জাফর হোসেন মনু, আলি আকবর সুজন, শামছুদ্দিন ভুট্টু, সাহাব উদ্দিন, নাছির উদ্দিন মঞ্জু, আবু ইউসুফ সুমন ও তোফাজ্জল হোসেন জুয়েল।

বাকি চার আসামির মধ্যে আবদুস সবুরের ফাঁসির দণ্ড পাল্টে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কামরুল হাসান সোহাগ, রাশেদ ড্রাইভার ও কামাল হোসেন ওরফে এলজি কামালের ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখেছে আদালত, এরা সবাই পলাতক।

২০০৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে নোয়াখালী শহরের ‘মোবাইল ফেয়ারের’ মালিক ফিরোজ কবির মিরণ ও তার দোকানের কর্মচারী সুমন পাল নগদ ১৩ লাখ টাকা ও কিছু মোবাইল ফোন সেট নিয়ে রিকশায় বাড়ি ফিরছিলেন।

পথে নাপিতের পুল এলাকায় সন্ত্রাসীরা তাদের দুজকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। পরে টাকা ও মালামাল ছিনিয়ে নিয়ে তাদেরকে কুপিয়ে খুন করে মরদেহ সড়কের পাশে ফেলে যায়।

এই ঘটনার পরদিন নিহত মিরনের বাবা এবি সিদ্দিক বাবুল মিয়া বাদী হয়ে ২৩ জনকে আসামি করে সুধারাম মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

১০ জনকে খালাস দিয়ে ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা দায়রা জজ এ এন এম মোরশেদ খান ১২ জনের ফাঁসির রায় দেন। সোলাইমান জিসান নামে এক আসামি আগেই র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন।

রায় ঘোষণার পর আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন মোল্লা বলেন, ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিল বিবেচনায় নিয়ে উচ্চ আদালত ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ৮ জনকে খালাস দিয়ে এবং অনতিবিলম্বে তাদেরকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন মোল্লা বলেন, অন্য তিন আসামি ঘটনার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার বিষয়ে তাদের স্বীকারোক্তি বিবেচনায় নিয়ে তাদের ফাঁসির দণ্ডাদেশ হাইকোর্ট বিভাগ বহাল রেখেছেন।

আব্দুস সবুরের সাজা কমানোর বিষয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে মামলা প্রমাণিত হয়েছে মর্মে বিজ্ঞ আদালত সাব্যস্ত করে তাকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ কমিউট করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন।’

আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজহার উল্লাহ ভুঁইয়া বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথ বিচার বিশ্লেষণ না করে ‘খেয়ালের বশে’ বিচারিক আদালতে অধিক সংখ্যায় ফাঁসির রায় ঘোষণার বিষয়ে উচ্চ আদালত উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

তিনি জানান, এ বিষয়ে হাইকোর্ট রায় ঘোষণার সময় উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, আইন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথ বিবেচনায় না নিয়ে ‘হুইমের’ উপর ভিত্তি করে এই রায় প্রদান করা হয়েছে, যেটা উচিত নয়।

তিনি জানান, এসময় আরও সতর্কভাবে সাক্ষ্যপ্রমাণ পরীক্ষা করা এবং আইনকে যথাযথভাবে বিবেচনায় রেখে এই ধরনের মামলাগুলি নিষ্পত্তি করার জন্য উচ্চ আদালত তাগিদ দিয়েছেন।

আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা বলেন, ট্রায়াল কোর্ট ফাঁসির দণ্ড দিতে বেশি ভালোবাসেন। পুংখানুপুংখভাবে বিচারবিশ্লেষণ না করে এই যে গণহারে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হচ্ছে, হাইকোর্টের অদ্যকার রায়ের মাধ্যমে এটাই প্রতিফলিত হয়েছে।

তিনি বলেন, সময় এসেছে বিচারালয়ে যারা আছেন, বিচার কাজের সাথে সম্পৃক্ত এখন দেখেশুনে, সাক্ষ্যপ্রমাণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাক্ষীসাবুদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রায় প্রদানের সময় এসেছে বলে আমি মনে করি।