অভি পকেট থেকে পিস্তল বের করে আমার মাথায় তাক করে: তিন্নির বাবা

সাবেক সংসদ সদস্য অভির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন হত্যাকাণ্ডের শিকার মডেল সৈয়দা তানিয়া মাহবুব তিন্নির বাবা সৈয়দ মাহবুবুল করিম। এদিন তিন্নির চাচা সৈয়দ রেজাউল করিমও সাক্ষ্য দেন।

বুধবার ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত জেলা দায়রা জজ কেশব রায় চৌধুরীর আদালতে আলোচিত এই মামলার সাক্ষ্য দেন নিহতের বাবা ও চাচা। আলোচিত এই মামলায় একমাত্র আসামি সাবেক ছাত্রনেতা ও জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভি দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় অবস্থান করছেন।

সাক্ষ্য দিতে গিয়ে প্রায় ১৯ বছর আগের স্মৃতি হাতড়ে বেশ কিছু ঘটনা তুলে ধরেন মডেল তিন্নির বাবা সৈয়দ মাহবুবুল করিম।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের বুড়িগঙ্গা নদীর ১ নম্বর চীন মৈত্রী সেতুর ১১ নম্বর পিলারের পাশে ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর রাতে মডেল তিন্নির লাশ পাওয়া গিয়েছিল।

ঘটনার পাঁচ দিন আগের ঘটনার সূত্র ধরে মাহবুবুল করিম বলেন, তিন্নি তাকে ৫ নভেম্বর রাত ৯টার দিকে টেলিফোন করে ধানমন্ডি যেতে বলেছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর ‘বাবু’ নামের একজনের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেন তিন্নি। সেই ওই ‘বাবু’ ছিলেন অভি। সেখান থেকে তিন্নিকে নিয়ে বাসায় চলে এসেছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, আসার সময় আমি তিন্নিকে জিজ্ঞাসা করি, অভির সাথে এই ঘোরাঘুরি কেন? তিন্নি বলে, ‘অভির সাথে তার অ্যাফেয়ার, অভি তাকে বিয়ে করবে’। তিন্নি তখন ছিলেন বিবাহিত, তার স্বামী ছিলেন পিয়াল।

মাহবুবুল করিম বলেন, আমি তিন্নিকে তার স্বামী পিয়ালের কথা বলি। তাকে বলি, এখন তুমি কীভাবে অভিকে বিয়ে করব? তিন্নি বলে, ‘আমি পিয়ালের সাথে থাকতে চেয়েছি, কিন্তু সে আমাকে ধরে রাখতে পারেনি’।

পরদিন ৬ নভেম্বর রাত ১০টায় অভি মাহবুবুলকে তিন্নি-পিয়ালের বাসায় ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে পিয়াল, পিয়ালের ভাই রিয়াল এবং দুই গৃহকর্মী নারী ছিলেন।

তিন্নির বাবা বলেন, অভি আমাকে বলে, পিয়ালের কাছ থেকে তালাক নিয়ে নিব। তারপর অভি পিয়ালকে ধমকের সুরে বলে, সে ২টা ব্যাকডেটে ডিভোর্স লেটার পাঠাবে, সেগুলো যেন সিগনেচার দিয়ে দেয়।

তিনি বলেন,অভি পিয়ালকে জিজ্ঞাসা করে, এই বাসার মধ্যে তোমার কী কী জিনিস আছে? পিয়াল বলে যে যা আছে সবই তার। তারপর অভি বলে, রোজার ঈদের পরেই সে তিন্নিকে বিয়ে করবে। তখন রোজা চলছিল। অভি বলে মেয়ে আনুশকা (পিয়াল-তিন্নির মেয়ে) পিয়ালের কাছে থাকবে। তারপর অভি অদ্ভুত ধরনের চেহারা করে তিন্নিকে চার্জ করে বলে যে সে কতজনের সাথে রাত যাপন করেছে। তিন্নি আমার সামনে সব স্বীকার করে। তারপর অভি তিন্নিকে বলে তার ব্যাংকে কত টাকা আছে? তিন্নি বলে -৭০ হাজার টাকা আছে। মাঝে পিয়াল বলে, ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছিল। তখন অভি তিন্নিকে বলে সে কেন মিথ্যা বলল?

তিনি আদালতে বলেন, একপর্যায়ে পিয়াল অভিকে বলে, অভি ভাই আপনাকে নাকি তিন্নির বাবা দেখে নেবে। অভি সাথে সাথে পকেট থেকে পিস্তল বের করে আমার মাথার ডান পাশে তাক করে বলে, ওই শালার বেটা, তোর সাহস আছে আমাকে দেখে নিবি? আমি তখন ভয়ে বলি, আমি তো আপনারে চিনি নাই। তখন অভি বলে- এখন বুঝছস তো আমি কে? এরপর অভি পিস্তল নামায়। তারপর আমাকে বলে- এই বাসায় আর আসবি না। আরও বলে, সে তিন্নিকে নিয়ে হজ করতে যাবে। আমি তখন বলি, তুমি কোন আইনে বিয়ে ছাড়া তিন্নিকে নিয়ে ওমরাহ করতে যাবে? পরে আমাকে চলে যেতে বললে আমি রাত ১২টার দিকে বাসায় চলে আসি।

মাহবুব করিম বলেন, ৭/৮ তারিখ আমি আর তিন্নি কেউ কারও বাসায় যাইনি বা দেখা হয়নি, দুজনই আমরা লজ্জা পাচ্ছিলাম। ১০ তারিখ সন্ধ্যার পর সে আমার বাসায় আসে। তিন্নি ৫-৭ মিনিট, বেশি হলে ১০ মিনিট ছিল। দাদার পা ধরে সালাম করে। বুকে জড়িয়ে আদর করে। আমাকে সরি বলে। তারপর ছাদে গিয়ে আমার মা যেখানে মারা গিয়েছিল, সেখানে গিয়ে সালাম করে। এরপর আমি তিন্নিকে থাকতে বলি। তিন্নি বলে, অভি এসে নাকি ফাংশনে নিয়ে যাবে, তাকে যেতে হবে। তারপর তিন্নি চলে যায়।

তিন্নির বাবা বলেন, ৯টার সময় (সেদিন) তিন্নির বাসার কাজের মেয়ে বীনা আমার বাসায় এসে জিজ্ঞাসা করে তিন্নি আপু কোথায়? আমি বলি, ও তো চলে গেছে আরও আগে। বীনা বলে, অভি ভাই আইসা তিন্নিকে না পাইয়া রাগারাগি করতেছে। রাত ১০টা পর্যন্ত বীনা ২/৩ বার আসে তিন্নিকে খুঁজতে। আমরাও অস্থির হয়ে যায়। খুঁজতে শুরু করি। রাত ১১টার দিকে আব্বা বড় ভাইকে বলে, তোরা রাতে বাসায় থাকিস না, অভি এসে শাসিয়ে গেছে। আব্বা আমাদের কোথাও চলে যেতে বলে। ভাইয়া তখন আমাকে রামপুরার এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে যায়। পরদিন আমাকে ওখানে রেখে ভাইয়া কলাবাগানের বাসায় চলে আসে। ১৫ তারিখ পর্যন্ত আমি ওখানেই ছিলাম। ১৫ তারিখ সকাল ৯/১০টার সময় মামাতো ভাই পেপারে তিন্নির লাশের ছবি দেখে আমাকে দেখায়। আমি লাশ দেখে চিনতে পারি।

মাহবুবুল বলেন, পরে আমরা পত্রিকায় এবং মানুষের মুখে শুনতে পারি যে, অভিই তিন্নিকে হত্যা করেছে। তিন্নির লাশ যেদিন পত্রিকায় ছাপা হয় সেদিন সকাল বেলা কলাবাগানে অভির সাথে আমার ভাইয়ের দেখা হয়। অভি বলে, ‘তিন্নিকে খুঁজতে হবে না’। অভি ভাইয়াকে ৫০০ টাকা দিয়েছিল। কিন্তু ভাইয়া নেয়নি।

বুধবার মাহবুবল করিম সাক্ষ্য দেওয়া শেষ করার পর তার বড় ভাই সৈয়দ রেজাউল করিমও সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন। তবে শেষ করতে পারেননি।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ভোলা নাথ দত্ত জানান, সাক্ষী রেজাউল করিম অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষ সময়ের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করে আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী দিন ধার্য করেন।

তিন্নির মরদেহের ছবি পত্রিকায় ছাপা হলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে ২০০২ সালের ২৪ নভেম্বর তদন্তভার সিআইডিতে ন্যস্ত হয়।

মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভির অনুপস্থিতিতেই ২০১০ সালের ১৪ জুলাই ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তিন্নি হত্যা ও মরদেহ গুম সংক্রান্ত মামলায় অভিযোগ গঠন করেন।

এই মামলাটির রায়ের তারিখ ঠিক হওয়ার পর গত ১৫ নভেম্বর আদালতে হাজির হন তিন্নির বাবা ও চাচা। তারা বলেন, তারা মামলার অগ্রগতির খবর জানতেন না বলে সাক্ষ্য দিতে আসতে পারেননি।

তখন আদালত রায় না দিয়ে তাদের সাক্ষ্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর বিচারক কেশব রায় তাদের সাক্ষ্য নেওয়ার জন্য ৫ জানুয়ারি দিন ঠিক করে দেন। সে অনুযায়ী বুধবার আদালতে হাজির হন বয়োবৃদ্ধ এই দুই ব্যক্তি।