ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের সহিংসতার ঘটনায় ১৪টি মামলায় কারাগারে থেকেও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন মনিরুল ইসলাম।
পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার তালশহর পূর্ব ইউপি থেকে তিনি বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ইসলামী ঐক্যজোটের সদর উপজেলার যুগ্ম-সম্পাদক। তিনি তালশহর পূর্ব ইউনিয়নের তেলীনগর গ্রামের নাগর গোষ্ঠীর মৃত ফজর আলী মাস্টারের ছেলে।
গত বছরের ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের কর্মী-সমর্থকেরা হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতা চালান। এসব সহিংসতার ঘটনায় ১৪টি মামলায় মনিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গত বছরের ২১ জুন তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এর পর থেকেই তিনি বন্দী। কারাগারে থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মনিরুল। তবে এলাকায় তিনি ইসলামী ঐক্যজোট নেতা হিসেবেই পরিচিত।
তবে মনিরুল কারাগারে থাকায় তার পক্ষে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার কাজ করেছেন সাবেক ইউপি সদস্য হুসেন মিয়া। তিনি এই প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি সম্পর্কে মনিরুল ইসলামের চাচাতো ভাই।
হুসেন মিয়া বলেন, ‘গত বছরের ২১ জুন হেফাজতের সহিংসতার ঘটনায় মনিরুল ইসলামকে আটক করে ১৪টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ পর্যন্ত ১৩টি মামলায় মনিরুলের জামিন হয়েছে। সবশেষ গত ২০ ডিসেম্বরও একটি মামলায় তিনি জামিন পান। কিন্তু একটি মামলায় জামিন পেলে আবার আরেকটি মামলা সামনে আসে।’
এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেন মনিরুলের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ও ১০ বছরের মেজো ছেলে সাইফুল ইসলাম। বড় ছেলে কিছুটা সহজ-সরল হওয়ায় মেজো ছেলেকে নিয়েই মাঠে ছিলেন তাসলিমা। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই মা-ছেলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট ভিক্ষা করেন। তারা প্রত্যেক ভোটারের কাছে গিয়ে করজোড় ভোট প্রার্থনা করেন। তারা মনিরুল জেলে আছে, ভোটাররা দয়া করে ভোট দিলে সে কারাগার থেকে মুক্তি পাবে এমন বলে মানুষকে আকৃষ্ট করেন। তাদের প্রচারণা পুরো ইউনিয়নে ঝড় তুলে। বিশেষ করে ১০ বছরের ছেলে সন্তান সাইফুল মায়ের সঙ্গে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাবার ভোট চাওয়ায় সাধারণ ভোটাররা তাদের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন।
স্ত্রী তাসলিমা আক্তার জানান, আমার স্বামী আগের নির্বাচনে হেরে যান। এবার আছেন জেলে। তাই আমরা মা-ছেলে মানুষের দয়া ও ভোট চেয়েছি। নির্বাচনের আগে জেলখানায় গেলে তিনি আমাকে নির্বাচনের কথা জানান। বৃহস্পতিবার তিনি ব্যস্ত সময় পার করেছেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর থেকে মানুষের ভিড় বাড়িতে। আজ সারা দিন মানুষের সঙ্গে বাড়িতে সময় দিয়েছি।
জানা গেছে, মনিরুল একসময় এলাকার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মানিক মিয়ার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিগত ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পদ থেকে পদত্যাগ করে নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচন করে হেরে যান। এরপর থেকে ইসলামি ঐক্যজোটের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠে।
গত বুধবার সদর উপজেলার ১০টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে তালশহর পূর্ব ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে আটজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই ইউনিয়নের ৯ কেন্দ্রে ভোট হয়। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল ইসলাম চশমা প্রতীকে তিন হাজার ৯৬১ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকের আব্দুস সালাম পেয়েছেন দুই হাজার ৪৭২ ভোট। তবে তারা দুজনই একই ওয়ার্ড তেলীনগরের বাসিন্দা।
জেলা ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম সম্পাদক মুফতি এনামুল হাসান বলেন, মনিরুল সদর উপজেলা ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তবে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি এলাকায় খুবই জনপ্রিয় ব্যক্তি। তার পরিবার ও গোষ্ঠীর লোকদের পাশাপাশি ইসলামী ঐক্যজোট ও ছাত্র খেলাফতের স্থানীয় নেতা কর্মীরা তার পক্ষে কাজ করেছেন।