‘যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইয়াও কাওয়ালি কিংবদন্তি ফরিদ আয়াজের গুণমুগ্ধ হতে পারেন’

টিএসসিতে কাওয়ালি অনুষ্ঠান— গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীতে আলোচনায় রয়েছে। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। এবং শেষ পর্যন্ত একটি ছাত্র সংগঠনের হামলায় সেই আয়োজন পণ্ড হওয়ারও অভিযোগ এসেছে।

বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছেন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। বিশেষ করে, কাওয়ালি আয়োজন নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের বক্তব্য নিয়ে তার কথা। পাশাপাশি চিন্তার মুখোমুখি অবস্থান নিয়েও তার আপত্তি।

তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইয়াও আপনি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ বা কাওয়ালি কিংবদন্তি ফরিদ আয়াজের গুণমুগ্ধ হতে পারেন।

একপর্যায়ে এমনও বললেন, দেশের মানুষদের মধ্যে যখন গোঁড়ামি দেখি, বুক ব্যথা করে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ফারুকী ফেইসবুকে লেখেন, ‘একটা পোস্ট দেখলাম, যেখানে বলা হচ্ছে কাওয়ালি বঙ্গবন্ধুও শুনতেন। আরেকটাতে দেখলাম, কাওয়ালি ভারত থেকে এসেছে। পোস্ট দুইটার পেছনে উদ্দেশ্য বুঝতে পারলাম, কাওয়ালি অনুষ্ঠানের বৈধতা তৈরি করা। কী দিন আসলো!!!’

সদ্য বাবা হয়েছে এ নির্মাতা। সে প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার দিনরাত এখন ইলহামকে ঘিরে। ফলে ওর বাইরে দুনিয়াতে কি হচ্ছে তা জানার সময়ও পাই না। কিন্তু কখনো কখনো দু-একটা কথা না বলে পারা যায় না। কারণ এই দেশটাকে আমরা সবাই খুব ভালোবাসি। ফলে দেশের মানুষদের মধ্যে যখন গোঁড়ামি দেখি, বুক ব্যথা করে। তখন মনে হয় কিছু কথা বলে যাই। আমরা একদিন থাকবো না, কিন্তু আমাদের সন্তানেরা থাকবে। তারা যেন একটা সত্যিকারের সহনশীল সমাজ পায় যেখানে মানুষজন সাদা-কালো চিন্তা না করে ক্রিটিক্যাল চিন্তা করার সুযোগ পায়। সেই ভাবনা থেকেই এই কয়টা কথা বলতেছি।’

‘আমাদের দেশে প্রধানত দুইটা ধারা। একটা দাবি করা হচ্ছে সেক্যুলার বলে, আরেকটা রিলিজিয়াস। দুইটা ধারারই চিন্তা এবং ইন্টেলেকচুয়াল হাইট বেদনাদায়ক ভাবেই সমান। দুই দল থেকেই বছরের পর বছর মানুষজনকে ঘৃণার বিষ গিলানো হইছে। দুইটারই মন্ত্র এক- হয় তুমি সাদা, নয় কালো! হয় তুমি বন্ধু, নয় শত্রু। সাদা আর কালোর মাঝখানে যে গ্রে বলে একটা এরিয়া আছে সেটা আমাদের মাথায় মনে হয় আর নাই। ফলে ঢালাও ভালোবাসা আর ঢালাও ঘৃণা নিয়াই চলতেছে আমাদের এইসব দিনরাত্রি।

যে কারণেই একদল কাওয়ালি শুনলেই তেড়ে আসে, আরেক দল হিন্দি শুনলেই যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠে।’

‘কিন্তু এটা আমাদের মাথায় ঢোকে না পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইয়াও আপনি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ বা কাওয়ালি কিংবদন্তি ফরিদ আয়াজের গুণমুগ্ধ হতে পারেন। জমিদারি আমলে করা কোলকাতা কেন্দ্রিক উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অত্যাচারের নিন্দা করেও আপনি শিবকুমার শর্মা বা এ আর রহমানের ভক্ত হতে পারেন। কিন্তু এইসব একচোখা সাদাকালো বুদ্ধিজীবীতা কিংবা ধর্মীয় নেতাদের বয়ান আপনারে ক্রিটিক্যালি কিছু ভাবতে দেয় না, আপনি গ্রে এরিয়া দেখতে পারেন না। আপনি তখন হয় পক্ষে নয় বিপক্ষে থিওরির সাবস্ক্রাইবার হন। আপনি তখন "যে বিমান পাকিস্তানের ওপর দিয়ে যায়, সেই বিমানে চড়ি না" ধরনের বয়ান তৈরি করেন। কিংবা যদি বিপরীত পথের হন, তখন ভারতীয় দেখলেই আপনার অসহ্য লাগে, কিংবা মুসলমান হয়ে পূজায় বা বড়দিনে শুভেচ্ছা জানাইলে আপনার মাথায় রক্ত উঠে যায়।

এই বিগোট্রিই আমাদের জাতির বিকাশে প্রধান বাধা মনে হয় আমার কাছে। এটার চর্চা যত দিন বন্ধ না হবে তত দিন আমাদের হয়তো কুয়ার ব্যাঙ হয়েই থাকতে হবে। এ বড় আশঙ্কার কথা।’

এ দিকে মুক্তি অপেক্ষায় আছে ফারুকীর ‘নো ল্যান্ডস ম্যান’। নির্মাণের ঘোষণায় রয়েছে ‘আ বার্নিং কোয়েশ্চেন’।