চীনের এক কিশোরকে তার বাবা-মা শিশু বয়সেই বিক্রি করে দিয়েছিল। এরপর সম্প্রতি সে তার বাবা-মার কাছে ফিরে আসলে ফের তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। আর এই দুঃখে ১৭ বছর বয়সী ওই কিশোর আত্মহত্যা করেছে।
চীনা সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার সকালে হাইনান প্রদেশে লিউ জুয়েজু নামের ওই কিশোর আত্মহত্যা করেছে। এই ঘটনায় চীনজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে।
১৭ বছর বয়সী ওই কিশোরের গল্প প্রথম চীনের মানুষের নজরে আসে যখন সে তার জন্মদাতা বাবা-মাকে খুঁজে পেতে সাহায্যের জন্য অনলাইনে একটি ভিডিও পোস্ট করে।
চীনা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, লিউকে তার বাবা-মা ২০০৫ সালে মাত্র এক বছর বয়সেই বিক্রি করে দিয়েছিল। কিন্তু তার পালক বাবা-মা পরে একটি দুর্ঘটনায় মারা যায়। এরপর লিউ তার জীবনের বেশির ভাগ সময় ওই পালক দাদা-দাদি এবং অন্যান্য আত্মীয়দের সঙ্গে কাটায়।
গত বছরের ডিসেম্বরে ১৭ বছর বয়সী লিউ তার জন্মদাতা বাবা-মাকে খুঁজে পায়। তার জন্মদাতা বাবা-মা একবার ডিভোর্সের পর আবার বিয়ে করেছিল। অনলাইনে অনুসন্ধানের মাধ্যমে লিউ তার বাবা-মাকে খুঁজে পায়।
লিউ সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছিল যে, প্রথমে তাদের পুনর্মিলন বেশ সুখের একটি বিষয় ছিল। কিন্তু পরে সে তার বাবা-মার কাছে আর্থিক সাহায্য চাইলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
লিউ জানায় সে তার বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, সে তাদের সঙ্গে থাকতে পারবে কিনা বা তার বাবা-মা তার জন্য একটি বাড়ি কিনে দিতে বা ভাড়া করে দিতে পারবে কিনা।
লিউর অভিযোগ, এই কথা শুনে তার জন্মদাতা বাবা-মা তার সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিন্ন করে। এমনকি তার মা তাকে ম্যাসেজিং প্ল্যাটফর্ম উইচ্যাট-এ ব্লক করে দেয়।
তবে লিউর বাবা-মা এই বিষয়ে ভিন্ন কথা বলেছেন। তার মা বলেছেন, লিউ তাকে একটি বাড়ি কিনে দেওয়ার জন্য জোরাজুরি করছিল। কিন্তু তার পক্ষে বাড়ি কিনে দেওয়া সম্ভব নয়।
লিউ পরে বলেছিল যে, সে তার জন্মদাতা বাবা-মার বিরুদ্ধে তাকে আশ্রয় না দেওয়ার অভিযোগে মামলা করবে। ওয়েইবোতে এক পোস্টে সে বলেছিল, ‘তাদেরকে আদালতে তুলে ছাড়ব’।
এরপর লিউ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। অনেকে তাকে এই বলে নিন্দা করে যে, সে শুধু তার বাবা-মার কাছ থেকে একটি বাড়ি পেতে চায় এবং সে লোকের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছে।
গতকাল সোমবার মধ্যরাতের ঠিক পরে লিউ ওয়েইবোতে একটি দীর্ঘ লেখা পোস্ট করে। সেখানে সে তার জীবনের ঘটনাগুলো এবং কীভাবে সে অনলাইনে আক্রমণের শিকার হয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়।
লিউ জানায়, ‘আমি অনেক গালি সহ্য করেছি’। সে জানায়, তার জন্মদাতা বাবা-মা তাকে কার্যত ‘দুবার পরিত্যাগ’ করে।
তার নোটের শেষ লাইনে লিউ জানায় যে, ‘আমার এই জীবন শেষ করছি’। ওই পোস্টের পর অনলাইনে অসংখ্য লোকে তাকে আত্মহত্যা না করার উন্মত্ত আহ্বান জানিয়ে মন্তব্য করতে থাকে এবং তার আশপাশের লোকদের তাকে খুঁজে বের করতে বলে।
পরে লিউর এক আন্টি সংবাদমাধ্যমকে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ওয়েইবোতে ওই পোস্ট দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায় এবং দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সোমবার ভোরে তার মৃত্যু হয়।
লিউর মৃত্যুর পর ওয়েইবোতে তার পেজটিতে সহানুভূতির মন্তব্যের বন্যা শুরু হয়। অনেকে তার নিন্দাকারীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
একজন বলেন, ‘একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্যই সাইবার বুলিং সহ্য করা কঠিন, সেখানে একটি শিশুর জন্য তা অসম্ভবই বটে’।
একজন বলেন যে তিনি আশা করছেন লিউ ‘তার পরবর্তী জীবনে’ একটি ভালো পরিবার পাবে। ‘আমি আশা করি আপনার পরবর্তী জীবনে আপনি এমন বাবা-মা পাবেন যারা আপনাকে রক্ষা করবে, এমন ভাই এবং বোন পাবেন যারা আপনাকে ভালোবাসবে এবং আপনি কোনো উদ্বেগ ছাড়াই জীবনযাপন করবেন’।