নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া আইনকে ‘নতুন মোড়কে পুরনো জিনিস’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
শনিবার বিকালে বনানীতে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, আইন করার পরও অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে। নতুন করা আইনটি পুরাতন পদ্ধতিকে একটি আইনগত কাঠামোতে এনে আইনসম্মত করা হচ্ছে।
জিএম কাদের বলেন, আমরা প্রস্তাব করেছিলাম আগামীতে যে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে তার জন্য উপরোক্ত সংবিধানের বিধান অনুসারে একটি আইন করা দরকার। আইনের উদ্দেশ্য হবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশন গঠন ও সে অনুযায়ী যোগ্য ও মোটামুটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের বাছাই করার মাপকাঠি ও পন্থা সুনির্দিষ্ট করা।
তিনি বলেন, আমরা যোগ্যতার মাপকাঠি বলতে দায়িত্ব পালনের দক্ষতাকে বুঝিয়েছি। মোটামুটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বলতে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে নিরপেক্ষ ব্যক্তি নির্বাচনের কথা বুঝিয়েছিলাম।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে দলটির চেয়ারম্যান বলেন, আমরা উল্লেখ করেছিলাম আমাদের সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’কিন্তু বাস্তবে এ বিষয়টি খুব একটা কার্যকর হতে দেখা যায় না। ফলে কিভাবে এটি প্রযোজ্য হবে বা কার্যকর করা যাবে তার বিস্তারিত বর্ণনা থাকা আবশ্যক।
বর্তমান আইনে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই জানিয়ে জিএম কাদের বলেন, আমাদের প্রস্তাব ছিল সে কারণে এ বিষয়েও একটি আইন থাকা প্রয়োজন। যে আইনে, নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচনী কাজে কোনো কর্মচারী নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাবলী পালন না করিলে নির্বাচন কমিশন নিজেই যেন প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে এইরকম একটি আইন করা দরকার।
তিনি বলেন, যথোপযুক্ত নির্বাচন কমিশন গঠন করলেই তা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে না; যতক্ষন পর্যন্ত না সে নির্বাচন কমিশনকে কর্তব্য সম্পাদনের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ও সহযোগিতা দেওয়া হয়। বর্তমান যে আইনটি পাশ হয়েছে তাতে শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশন গঠন বিষটি বিবেচনা করা হয়েছে, তাদের যথাযথ ক্ষমতার বিষয়টি বিদ্যমান আইনের আওতায় আনা হয়নি।
সংসদে প্রধান বিরোধী দলের চেয়ারম্যান জানান, ইসির ক্ষমতার বিষয়টি বিদ্যমান আইন কিংবা আলাদা একটি আইন হিসাবে আনা দরকার ছিল বলে মনে করে জাতীয় পার্টি।
সার্চ কমিটি সম্পর্কে তিনি বলেন, সম্প্রতি প্রণীত আইনে একটি সার্চ কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়েছে। সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সার্চ কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি। সার্চ কমিটির মাধ্যমে মনোনীত ব্যাক্তিদের নাম ও পরিচয় সম্বলিত তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থায় প্রকাশ করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
সার্চ কমিটির নাম প্রস্তাবে যথেষ্ট সময় রাখা হয়নি দাবি করে জিএম কাদের বলেন, মাত্র ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে নাম প্রস্তাব করার বিধানটি বেশি তাড়াহুড়ো বলে মনে হয়; যা জনমনে সংশয় সৃষ্টি করতে পারে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, আমরা মনে করি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়ার পূর্বে সার্চ কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত নামসমূহ জনগণের সামনে প্রকাশ করা প্রয়োজন ও জনগণের মতামত প্রদানের ব্যবস্থা রাখা উচিত।
জনগণের মতামত বিবেচনায় এনে তালিকা সংশোধনের সুযোগ রাখার ব্যবস্থা রাখলে বাছাইয়ে সার্বিক বিষয়টি স্বচ্ছতা পেত বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন জিএম কাদের।
তিনি বলেন, সার্চ কমিটি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত তালিকাটি প্রকাশ করার বিধান না থাকার ফলে শেষ পর্যন্ত সেই তালিকার সুপারিশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে কি না সেই বিষয়ে সংশয় থাকে।
কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ৩ দফার কারণে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতামতের প্রধান্য দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তার দলীয় বিবেচনায় যে কোনো ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গকে মহামান্য রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে মনোনীত করার সুযোগ থাকবে।
এসময় ইসি গঠনে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া নতুন আইনেও অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে আগের মতো সংশয় থেকেই যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জিএম কাদের।
তিনি বলেন, এ আইন প্রণয়ন করার ফলে নির্বাচন কমিশন গঠন ও তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনের ক্ষমতায়নে আগের তুলনায় কোনো উন্নতি হবে বলে মনে হয় না। আগের মতোই উপরোক্ত বিষয়সমূহ পরোক্ষভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
দলের অবস্থান তুলে ধরে জিএম কাদের বলেন, জাতীয় পার্টি সব সময় চায় অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন। কারণ, নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রবেশদ্বার। নির্বাচন সঠিক হলেই দেশে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নতুন আইনে গঠিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেবে কী না তা জানতে চাওয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে।
জবাবে দলটির চেয়ারম্যান বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়নি। নির্বাচন কমিশন কী ধরনের মানুষকে নিয়ে গঠিত হচ্ছে, এগুলো পর্যবেক্ষণ করে এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত নেব। যে জায়গায় আমাদের সংশয় আছে, সেখানে আগামীতে কি হয় সেটা আমরা দেখব। তারপরে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। এখনই আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছি না।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুসসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।