শাবিপ্রবি সংকট: বাসা থেকে অফিস করছেন ভিসি, গানে গানে প্রতিবাদ অব্যাহত

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বাসায় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ শুরু করেছেন। রবিবার উপাচার্যের কার্যালয় খোলা থাকলেও নিজ কার্যালয়ে আসেননি তিনি।

বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেছি। কারণ শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সঠিক সময়ে যেন বেতন-ভাতা পায়, তাই আমরা দাপ্তরিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখব। তবে উপাচার্য অফিসে আসেননি, উনি তার বাসভবনে আছেন । জরুরি কোনো ফাইল আসলে ওনার বাসায় পাঠানো হবে।’

এদিকে, আন্দোলনের পর থেকে এখনো বাসা থেকে বের হননি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। তার পদত্যাগের দাবিতে প্রতিদিনই নতুন নতুন কর্মসূচি পালন করছেন আন্দোলনকারীরা।

উপাচার্যের বাসা থেকে অফিস করার বিষয়ে আন্দোলনকারীদের অন্যতম মুখপাত্র শাহরিয়ার আবেদিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শাবিপ্রবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে, তার পদত্যাগের দাবিতে তারই বাসভবনের সামনে ১৬০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অনশন করেছে। আমাদের দাবি মেনে নেয়া হবে এই আশ্বাস পেলেও এখনো আমরা তার পদত্যাগ বা অপসারণের কোনো ইঙ্গিত না পাওয়ায় আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, এমতাবস্থায় এই অবাঞ্ছিত উপাচার্যকে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে অফিস আওয়ার বা অন্য যেকোনো সময়ে তার কার্যালয় বা ক্যাম্পাসের অন্য যেকোনো স্থানে দেখা যায় তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া হবে ভয়ংকর। আমরা শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই এই নির্লজ্জ, মিথ্যাবাদী, স্বৈরাচারী ভিসিকে আমাদের ক্যাম্পাসে সহ্য করব না। আমাদের দাবি, অবিলম্বে তার পদত্যাগ নিশ্চিত করে বা তাকে অপসারণ করে আমাদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা হোক। গত ১৬ জানুয়ারি নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের উপর নারকীয় পুলিশি হামলার প্রধান মদদদাতা উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগের দাবিতে আমরা শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা ১৬ তারিখ থেকেই ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে আসছি। তার পদত্যাগের আগ পর্যন্ত আমাদের অহিংস  আন্দোলন চলবে।

উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে রবিবার শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন। এতে গান, রং তুলি, রোড পেইন্টিংসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এরই ধারাবাহিকতায় এদিন রাতে ‘গীতি-আলেখ্য’ নামক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তারা। অন্যান্য দিনের ধারাবাহিকতায় এদিন সন্ধ্যা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে গানে গানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন তারা।

৫ টং পুনঃস্থাপন

২০২০ সালে সমাবর্তনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু টং দোকান বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। পরবর্তীতে একই বছর  মার্চ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পাশাপাশি টং দোকানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হলে মাত্র ৩টি টং দোকান এবং ফুডকোর্ট চালু করে বাকিগুলোকে উঠিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া, ভিসি বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, ক্যাফেটেরিয়া, ফুডকোর্ট ও বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। পরবর্তীতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের খাবারের চাহিদা মিটাতে শিক্ষার্থীরা নিজ উদ্যোগে ‘চাষাভুষার টং’ নামে নতুন টং দোকান স্থাপন করে।

আন্দোলনের আরেক মুখপাত্র উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, শনিবার থেকে রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে উচ্ছেদকৃত টং গুলোর পুনর্নির্মাণ শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে পাঁচটি জায়গায় টং দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে শিক্ষা ভবন 'ই', 'বি' ও 'ডি' এর পাশে এবং চেতনা-৭১ ও ফুডকোর্ট এর পাশে টংগুলো স্থাপন করা হচ্ছে। এ দোকানগুলোর নাম ‘বাঁশ বাগান’, ‘চাষাভুষা’, ‘ওরা আটাশ’, ‘অর্বাচীন’ ও ‘লিচুতলা’ হতে পারে বলে জানান এই মুখপাত্র।

অনার্স প্রথম বর্ষের ভর্তি অনিশ্চিত

বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান ঘটনা এবং ভর্তি কমিটির বেশ কয়েকজন করোনা পজিটিভ হওয়ায় ২০২০-২১ সেশনের ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়েছে। গত ২২ জানুয়ারি অনির্দিষ্ট কালের জন্য ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা এ কার্যক্রম। এ বিষয়ে রবিবার ভর্তি কমিটির সদস্যসচিব সহযোগী অধ্যাপক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল হোসাইনি বলেন, ‘আমরা দুই একদিনের মধ্যে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেব’।

 ‘গীতি-আলেখ্য’

উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে রবিবার রাত ৮টায় ‘গীতি-আলেখ্য’ নামে এক সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এখানে গানে গানে ও কবিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আবেদিন বলেন, শাহ আব্দুল করিম, রাধারমণ দত্তের গান পরিবেশন করব আমরা। এ সকল গানের মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা ও ঘটনা তুলে ধরা হবে।

অনশনকারী শিক্ষার্থীদের চেকআপ সোমবার

আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থী জানান, অনশনকারী ১১জন মেয়েই মোটামুটি অসুস্থ। ছেলেদের অনেকেই ভালো রয়েছে। তবে গত দুই-একদিনে ভারী খাবার খেতে গিয়ে বমি করেছে কেউ কেউ। হজমেও সমস্যা হচ্ছে। সোমবার সবাইকে চেকআপের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, গত ২৬ তারিখ বুধবার অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা অনশন থেকে সরে আসলেও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ভিসি পদত্যাগের আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষার্থীরা।