উত্তর সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের আতমেহ শহরের একটি বাড়িতে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানের সময় নিহত হওয়ার আগে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে আইএসআইএল (আইএসআইএস)-কে আড়ালে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আবু ইব্রাহিম আল-হাশিমি আল-কুরায়শি।
গত বুধবার মধ্যরাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই অভিযান পরিচালনা করে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন যে, নিজেকে বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিয়েছে আবু ইব্রাহিম। নিজের সঙ্গে তার নিজের পরিবারের নারী ও শিশু সদস্যদেরও হত্যা করেছেন।
৪৫ বছর বয়সী এই ইরাকি আইএসআইএল-এর পূর্বসূরি ‘ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক’ এর একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক ছিল আল-কায়েদার একটি শাখা। মার্কিনিরা ২০০৩ সালে ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরপরই সংগঠনটি গড়ে উঠে।
২০১৯ সালে সিরিয়ায় একই রকম এক মার্কিন অভিযানের সময় তার পূর্বসূরি আবু বকর আল-বাগদাদি নিজেকে বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেওয়ার পরপরই আল-কুরায়শিকে আইএসআইএল এর নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
আল-বাগদাদি ইরাকি শহর মসুলের একটি মসজিদ থেকে ‘ইসলামী খেলাফত’ ঘোষণা করেছিলেন যখন তার যোদ্ধারা ২০১৪ সালে শহরটি দখল করে নেয়। এরপর ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে তারা।
অন্যদিকে, আল-কুরায়শি ছিলেন স্বল্প পরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব যিনি এমন এক সময়ে গোষ্ঠীটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যখন এটি নিজের দখলে থাকা সমস্ত অঞ্চল হারিয়েছে এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন, ইরাকি এবং অন্যান্য বাহিনীর তীব্র সামরিক চাপের মধ্যে পড়েছে।
আবদুল্লাহ আমির মোহাম্মদ সাইদ আল-মাওলা এবং হাজ্জি আবদুল্লাহ কারদাশ নামেও পরিচিত আল-কুরায়শি একজন নৃশংস নেতা হিসেবে বিবেচিত হন। কিন্তু আইএসআইএল নেতা হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি মূলত ইরাকি এবং মার্কিন গোয়েন্দাদের রাডারে ছিলেন।
সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে আবু ইব্রাহিমের নিজস্ব কিছু ধরন ছিল। প্রবল ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি। খবরের শিরোনামে থাকাও খুব একটা পছন্দ করতেন না। তারপরও মার্কিন এবং ইরাকি গোয়েন্দাদের নজর এড়াতে পারেননি তিনি। তাকে খতম করতে উঠেপড়ে লেগেছিল ওয়াশিংটন।
আবু ইব্রাহিম যখন আইএস-এর দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তখন সংগঠের ক্ষয়িষ্ণু দশা। মার্কিন বাহিনীর লাগাতার হামলার মুখে কার্যত দিশেহারা অবস্থা সংগঠনের। সেখান থেকে ফের আইএস-কে চাঙ্গা করার কাজ শুরু করেন আবু ইব্রাহিম। সেই কাজে ধীরে ধীরে সফলও হচ্ছিলেন তিনি।
আমেরিকার সরকার তার মাথার দাম হিসেবে ১ কোটি মার্কিন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল! সেইসঙ্গে, ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী’ তালিকাতেও আবু ইব্রাহিমের নাম নথিভুক্ত করেছিল তারা।
নিষ্ঠুর নীতি-নির্ধারক
আল-কুরায়শি ১৯৭৬ সালে মসুলের পশ্চিমে ইরাকের তুর্কমেন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত একটি ছোট শহর মুহাল্লাবিয়াতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন ধর্ম প্রচারকের পুত্র যিনি শহরের একটি মসজিদে জুমার নামাজ পড়াতেন।
জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন তার্কমেন (Turkmen) যা আদতে মধ্য এশিয়ার একটি জনগোষ্ঠী। আরব বংশোদ্ভূত না হওয়া সত্ত্বেও একটি ইসলামি জিহাদি গোষ্ঠীর শীর্ষনেতা হতে পেরেছিলেন তিনি। এমন কৃতিত্ব বিরল।
মসুলের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের ছাত্র হিসাবে তিনি আইএসআইএল-এর নিরাপত্তা এবং সামরিক মতবাদের চেয়ে ধর্মীয় নির্দেশনা এবং ইসলামি আইনশাস্ত্রে বেশি বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তবে, ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, সামরিক বাহিনী এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার মাধ্যমে তিনি অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।
ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে কোনো এক সময়ে তিনি সাদ্দাম হোসেনের সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন।
২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকে মার্কিন প্রতিনিধি ইরাকি সামরিক বাহিনীকে ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেওয়ার পরে এবং সাদ্দাম হুসেনের বাথ পার্টির সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার কমান্ডারকে কালো তালিকাভুক্ত করার পরে অনেক প্রাক্তন ইরাকি সেনা মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল।
আল-কুরায়শিও ২০০৩ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে ইরাকে মার্কিন দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহে যোগ দেন।
২০০৮ সালে মার্কিন বাহিনী মসুলে আল-কুরায়শিকে বন্দী করে এবং তাকে ক্যাম্প বুক্কা নামক একটি মার্কিন বন্দীশালায় আটকে রাখে।
ক্যাম্প বুকা আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেট অফ ইরাকের বন্দীদের আটকে রাখার জন্য কুখ্যাত ছিল। এসময় আল-বাগদাদি সহ অনেকের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করেন কোরায়শি। আল-কুরায়শি ২০০৯ সালে মুক্তি পান।
২০১৪ সালে আল-কুরায়শি আল-বাগদাদিকে উত্তর ইরাকের শহর মসুলের নিয়ন্ত্রণ নিতে সাহায্য করেছিলেন।
আল-কুরায়শি ‘দ্রুতই নিজেকে বিদ্রোহের সিনিয়র পদে প্রতিষ্ঠিত করে এবং তাকে ‘অধ্যাপক’ এবং ‘ধ্বংসকারী’ ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল’।
তিনি আইএসআইএল সদস্যদের মধ্যে একজন ‘নিষ্ঠুর নীতিনির্ধারক’ হিসেবে সমাদৃত ছিলেন এবং ‘যারা আল-বাগদাদির নেতৃত্বের বিরোধিতা করেছিল তাদের নির্মূল করার’ জন্য দায়ী ছিলেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা আল-কুরায়শির মৃত্যুর পর তাকে উত্তর ইরাকে ২০১৪ সালের সংখ্যালঘু ইয়াজিদিদের গণহত্যার পেছনের ‘চালিকা শক্তি’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে তিনি আফ্রিকা থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত আইএসআইএল এর শাখাগুলোর একটি নেটওয়ার্কের তত্ত্বাবধান করতেন।
আইএসআইএল ‘থামবে না’
ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলেছেন যে ২০১৭ সালে আইএসআইএল পরাজিত হলে আল-কুরায়শি সীমান্ত পেরিয়ে সিরিয়ায় পালিয়ে যাযন এবং তারপর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে লুকিয়ে ছিলেন এবং আইএসআইএলকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন।
হাডসন ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো মাইকেল প্রেজেন্ট আল জাজিরাকে বলেছেন যে, আল-কুরায়শির মৃত্যু আইএসআইএল-এর বিরুদ্ধে একটি ‘উল্লেখযোগ্য আঘাত’। তবে, সম্ভবত দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যক্রমে খুব সীমিত প্রভাব ফেলবে।
তিনি বলেন, ‘আইএসআইএল-এর কার্যক্রম এখনও জীবিত আছে, তারা এখনও ইরাকে আন্তঃসীমান্ত অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম এবং সিরিয়াতেও তাদের উপস্থিতি রয়েছে’।
‘কিন্তু আমি মনে করি কোরায়শির মৃত্যুর ফলে প্রাথমিকভাবে আইএস এর অধঃপতন ঘটবে, অনেকটা আল-বাগদাদির মৃত্যুর পরের মতো’।
আইএসআইএল তাদের নেতার হত্যার পর কে নেতৃত্ব নেবে তার পরিকল্পনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। আল-কুরায়শির মৃত্যু নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি তারা।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো অ্যারন ওয়াই জেলিন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস নিউজ এজেন্সিকে বলেছেন, ‘এটি এমন একটি সংস্থা যা ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে নয় বরং মতাদর্শের উপর নির্ভর করে টিকে আছে এবং থাকবে। যে কারণে যে কারো নেতৃত্বেই এটি পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে’।
‘আমি মনে করি, নতুন নেতা যেই হোক না কেন তার সঙ্গেই চলবে আইএসআইএল মেশিন’।