গাছ পুড়িয়ে কয়লা, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

ঢাকার সাভার ও ধামরাইয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কোনো অনুমতি না নিয়েই গড়ে উঠেছে গাছ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির অর্ধশতাধিক চুল্লি। নদীর পাড়, মূল সড়ক ও বসতবাড়ির পাশে গড়ে ওঠা এসব অবৈধ চুল্লিতে গাছ পুড়িয়ে কয়লা তৈীির সময় নির্গত ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিতের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। এছাড়া শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন আশপাশের লোকালয়ের বাসিন্দারা।

চুল্লিগুলোর মালিকরা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী হওয়ায় ভুক্তভোগীরা কোনো প্রতিবাদ করতেও সাহস পান না। আর সাভার ও ধামরাই উপজেলা প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও এই অবৈধ কর্মকাণ্ড রোধে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেই। অভিযোগ রয়েছে, এসব দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করেই চলছে গাছ পোড়ানোর মহাযজ্ঞ।

অবৈধ চুল্লিগুলোর মধ্যে ২৩টি ধামরাইয়ে এবং ৩০টি সাভারে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সাভারের ভাকুর্তায় মধুমতি মডেল টাউনের পেছনে রয়েছে ৩০টি চুল্লি। অন্যদিকে ধামরাইয়ের বালিয়া ইউনিয়নের বংশী নদী তীরবর্তী টেটাইল গ্রামে গড়ে উঠেছে ১০টি চুল্লি। নদীর অন্যপ্রান্তে দক্ষিণ গাঁওতারা গ্রামে রয়েছে আরও পাঁচটি চুল্লি। এছাড়া গোলাকান্দা গ্রামে তৈরি করা হয়েছে আটটি চুল্লি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গাছ পোড়ানোর প্রতিবাদ করলে এলাকাছাড়া করার হুমকি দেন চুল্লিমালিকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টেটাইল গ্রামে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা বানানোর ১০টি চুল্লির মালিক নাহিদ রানা স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তার অংশীদার মো. ইমরানের স্ত্রী ওই এলাকার সংরক্ষিত আসনের মহিলা মেম্বার। নদীর অন্যপ্রান্তে দক্ষিণ গাঁওতারা গ্রামের পাঁচটি চুল্লির মালিক নুরুল ইসলামও স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।

ধামরাই পরিবেশ আন্দোলনের আহ্বায়ক সিয়াম সারোয়ার জামিল বলেন, ‘যত্রতত্র অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কয়লা কারখানায় একে তো গাছ পুড়িয়ে বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে, অন্যদিকে ধোঁয়ায় পরিবেশে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।’

তবে পরিবেশকর্মীরা উদ্বেগ জানালেও দূষণ নিয়ে কোনো ভাবান্তর নেই চুল্লিমালিকদের। উল্টো দম্ভোক্তিমূলক কথা বলেন তারা। দক্ষিণ গাঁওতারা গ্রামের চুল্লির মালিক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ধোঁয়ায় পরিবেশের ক্ষতি তো একটু হবেই। লিখিত কোনো অনুমতি নেই। সবারই মুখে মুখে আছে।’

আরেক কয়লা কারখানার ব্যবসায়িক অংশীদার নাহিদ রানা বলেন, ‘পরিবেশের ক্ষতি হইলে হইবো। অবৈধ ব্যবসার অনুমতি দেয় নাকি কেউ? প্রশাসন ভাইঙ্গা দিলে দিবো।’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও যেন চুল্লিমালিকদের কাছে অসহায়। বালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মজিবর রহমান বলেন, ‘গ্রামের লোকজন গণস্বাক্ষর দিলেও চুল্লির মালিকরা দলীয় কর্মী হওয়ায় কিছু করতে পারছি না।’

ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নূর রিফাত আরা বলেন, ‘কাঠ পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন কার্বন ও সিসা বাতাসে মিশে যায়। এছাড়া ধোঁয়ার কারণে মানুষের ফুসফুসের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ এবং এলার্জি, চর্মরোগ ও চোখের সমস্যাসহ নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়।’ দূষণের বিষয়ে প্রায় একই ধরনের মত জানান সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সায়েমুল হুদা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ধামরাইয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী বলেন, ‘কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির কোনো অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। দ্রুতই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সাভারেও কয়লা কারখানার মালিকরা প্রভাবশালী। তাদের মধ্যে একজন ভাকুর্তা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাতেন হাজির বড় ভাই দেলোয়ার হোসেন। আরেক কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন না নেওয়ার কথা জানিয়ে দম্ভোক্তি করে বলেন, ‘আপনি যা পারেন করেন গিয়া।’

একই এলাকায় আরেকটি কারখানার মালিক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন মাঝেমধ্যে এসে ঘুরে যায়। তাদের চা-নাশতা খাইয়ে ম্যানেজ করেই এ অবৈধ ব্যবসা চালাতে হয়।’

অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক জহিরুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি