ইবাদতের সুফল

আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করে আদেশ করেছেন, একনিষ্ঠভাবে তার ইবাদতের জন্য। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়ে উল্লেখ আছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া অন্যকারও ইবাদত করবে না।’ সুরা বনী ইসরায়েল : ২৩

ইবাদত অর্থ আনুগত্য। পরিভাষায়, আল্লাহর জন্য হয়ে যাওয়া (আল্লাহর নির্দেশ বিনাদ্বিধায় মেনে নেওয়া) অথবা আল্লাহর নির্দেশে তার পছন্দসই কিংবা সন্তুষ্টিমূলক কাজ করা। আবার বলা যায়, ইবাদত বলতে এমন কর্মকে বোঝায়, যেগুলো করলে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। যেমন সুরা মায়েদার ৩৫ নম্বর আয়াতে এসেছে, ‘হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় কর এবং তার নৈকট্য অনুসন্ধান করো।’ ইবাদতের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এর কয়েকটি হলো-

স্রষ্টার প্রতি সম্মান প্রদর্শন : আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি না করলে, আমাদের কোনো অস্তিত্ব থাকত না। এই সুন্দর পৃথিবী যেমন আমরা পেতাম না ঠিক তেমনি সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব কোরআন মজিদও পেতাম না। এই সব মহামূল্যবান নেয়ামত দান করার কারণে স্রষ্টার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য ইবাদতের প্রয়োজন। ইসলামের ভাষ্যমতে জিন ও মানুষ সৃষ্টির প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত করা। সুতরাং সৃষ্টি হিসেবে স্রষ্টার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তার প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আদেশ-নিষেধ মেনে চলাই ইবাদতের মূল প্রয়োজনীয় দিক।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : মহান আল্লাহ আমাদের পরিপূর্ণ শারীরিক সক্ষমতা না দিলে পরনির্ভর জীবনে অভ্যস্ত হতে হতো। চোখ না থাকলে এই সুন্দর পৃথিবী যেমন দেখতে পেতাম না ঠিক তেমনি কোরআন তেলাওয়াতে সমস্যা সৃষ্টি হতো। কান না দিলে কিছুই শুনতে সক্ষম হতাম না, মুখ (বাক্শক্তি) না থাকলে অনায়াসে কথা বলতে পারতাম না। তো সেই হিসেবে বলা যায়, কৃতজ্ঞ হওয়ার জন্য আমাদের আল্লাহর ইবাদত করা প্রয়োজন।

রবের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক : আল্লাহতায়ালা আমাদের ভালোবেসে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কোরআনে করিম দান করেছেন। পরিপূর্ণ মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা দান করেছেন। ভালোকে ভালো ও মন্দকে মন্দ বলে চেনার ক্ষমতা দিয়েছেন। অর্থাৎ না চাইতেই এত গুছানো ও পরিপাটি জীবন দানের কারণে রবের সঙ্গে সম্পর্ক সুন্দর করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। অতএব এক্ষেত্রেও ইবাদতের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, কারণ ইবাদতের মাধ্যমেই স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।

মন্দ প্রতিহত ও কল্যাণ প্রসার : সৃষ্টিগতভাবে মানুষের মধ্যে দুটি প্রবৃত্তি রয়েছে ভালো ও মন্দ। মানুষ তার প্রভুর আনুগত্য করলে তার (আল্লাহর) নৈকট্যলাভের কারণে তার ভেতরের কু-প্রবৃত্তি শক্তিশালী হয়। ফলে তার মধ্যে ভালো গুণ ও বৈশিষ্ট্য বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে বান্দা ধীরে ধীরে আল্লাহর প্রিয় হয়ে ওঠে। আল্লাহর রঙে নিজেদের জীবন রঙিন করে। আল্লাহ এই শ্রেণির মানুষদের লক্ষ্য করে বলেছেন, (বল) আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করলাম। আর রং এর দিক দিয়ে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক সুন্দর? আর আমরা তারই ইবাদাতকারী। সুরা বাকারা : ১৩৮

আর যারা আল্লাহ থেকে নিজেদের গাফেল করে রাখে তাদের সম্পর্কে বলেছেন, আর অবশ্যই আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জিন ও মানুষকে। তাদের রয়েছে অন্তর, তা দ্বারা তারা বুঝে না; তাদের রয়েছে চোখ, তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের রয়েছে কান, তা দ্বারা তারা শুনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। তারাই হচ্ছে গাফেল। সুরা আল আরাফ : ১৭৯

অতএব ভালো-মন্দের সংমিশ্রণে নিজেদের না জড়িয়ে সঠিকভাবে ভালো ও কল্যাণকে গ্রহণের জন্য স্রষ্টার ইবাদত আবশ্যক।

দায়িত্বশীল হওয়া : দায়িত্বশীলতা একজন মুমিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। একজন মানুষ যত বেশি ইবাদতে যতœশীল সে পার্থিব জীবনে ততবেশি দায়িত্বশীল। যেমন একজন ব্যক্তি যখন সময় অনুযায়ী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের অভ্যাস করবে, তখন সে নামাজ আদায়ের জন্য হলেও নিজ দায়িত্বে বা কাজে মনোযোগ বাড়িয়ে দেবে। কাজে অলসতা নয় বরং কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছোট-ছোট সময় বের করবে জিকির-আজকারের জন্য। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে নামাজে যাওয়ার জন্য তার মন ব্যাকুল হয়ে পড়বে। এভাবেই একজন ইবাদতের প্রতি যতœশীল ব্যক্তি পৃথিবীতে তার কাজে দায়িত্বশীল হয়ে যাবে। আবার স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার ভয়ও তাকে দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলবে। সে মনে করবে তার কাজ আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত। আর এই ক্ষেত্রে আল্লাহর শাস্তিও বড় কঠিন। সুতরাং দায়িত্বশীল হতেও ইবাদত প্রয়োজন। এক কথায়, মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে নীতি নৈতিকতার মোড়কে আবদ্ধ রাখতে চাইলে, তার একমাত্র উপায় হলো মনেপ্রাণে আল্লাহর ইবাদত করা।