দুদকের তৎপরতা মিডিয়া কাভারেজের ওপর নির্ভর করে: আদালত

জ্ঞাত আয়বহিভূর্ত সম্পদ অর্জনের মামলায় ঢাকা-৭ সংসদীয় আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিমকে বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে।

রায় প্রদানকারী বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল  হক স্বাক্ষরের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে ৬৩ পৃষ্ঠার রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে হাজি সেলিমকে ৩০ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে। এ মামলায় জামিনে ছিলেন হাজী সেলিম।

রায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাহস ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্ট বলে, ‘হাজার হাজার দুর্নীতিগ্রস্তদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ ও সম্পদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে দুদকের শুধু তৎপরতা মিডিয়া কাভারেজের ওপর নির্ভর করছে।’ 

দুর্নীতিকে একটি ‘মানসিক ব্যাধি’ আখ্যায়িত করে আদালত বলেছে, ‘শুধু সাজা-শাস্তি দিয়ে এটি নির্মূল করা সম্ভব নয়।’ 

এ মামলায় হাজি সেলিমের আপিল সংশোধন (আংশিক  গ্রহণ ও আংশিক খারিজ)  করে গত বছরের ৯ মার্চ হাইকোর্টের এ বেঞ্চ তার ১০ বছরের সাজা বহাল রেখে রায় দেয়। এ ছাড়া বিচারিক আদালতের রায়ে তাকে দেওয়া ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে আরো এক বছর কারাদণ্ডের রায় বহাল থাকে।

তবে সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে হাজী সেলিমকে বিচারিক আদালতের দেওয়া তিন বছরের সাজা থেকে তাকে খালাস দেয় হাইকোর্ট। এ মামলায় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত যে সম্পদের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে মামলায় হাজী সেলিমের স্ত্রী গুলশান আরা সেলিমকে সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে তিন বছর কারাদণ্ড দিয়েছিল বিচারিক আদালত। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। হাইকোর্টের রায়ে তার আপিলটি বাতিল করা হয়েছে।

রায়ে হাইকোর্ট বলে, ‘দুর্নীতি একটি মানসিক ব্যাধি। এটি শুধু শাস্তি দিয়ে নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য সুবিধাবাদি ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি, গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের নাম প্রকাশ্যে আনতে হবে। তাদের তালিকা করে কমিশন, সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতের কর্তৃপক্ষ তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করে বার্তা দেবে। আমরা জানি এটা অনেক কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কারণ একজন সৎ ব্যক্তিও একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কিন্তু একটি আধুনিক দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও জাতি গঠনে আমাদের কোথাও না কোথাও থেকে শুরু করতে হবে।’

দুদকের উদ্দেশ্যে হাইকোর্ট বলে, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি, দুদক এখন পর্যন্ত এরকম হাজার হাজার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যাক্তিকে বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম হয়নি। দুর্নীতিবাজদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ, সম্পত্তির বিষয়ে নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সাহস ও সক্ষমতা না দেখিয়ে দুর্ভাগ্যবশত তারা মিডিয়া কাভারেজের ওপর নির্ভর করছে। দুদককে আমরা সত্যিকার অর্থেই তৎপর দেখতে চাই যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করবে। তার জন্য আমরা সক্রিয় এবং কার্যকর একটি কমিশন দেখতে চাই, যে কমিশন সাংবিধানিক পদধারী বা সাধারণ কর্মচারি যে-ই হোন না কেন, তাদের খুঁজে বের করে দুর্নীতির মূল উৎপাটন করবে। ’

দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের এ  রায়ের ফলে হাজী সেলিম আপিলের সুযোগ পেলেও তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। কেন না বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যাক্তি ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর অন্তত দুই বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং তার মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন না। তাই চূড়ান্ত বিচারের আগেই তিনি আর এ পদে থাকতে পারেন না।’

অন্যদিকে হাজী সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রায়ের অনুলিপি আমরা পেয়েছি। এই অনুলিপি বিচারিক আদালতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি (হাজি সেলিম) আত্মসমর্পণ করবেন।’

তিনি বলেন, ‘এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব। তাই চূড়ান্ত বিচারের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। সে পর্যন্ত তার এমপি পদে থাকতে বাধা নেই। আর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না সেটি দেখবে জাতীয় সংসদ ও স্পিকার। দুদকের তো এবিষয়ে কিছু বলার এখতিয়ার নেই।’  

হাজি সেলিমের বিরুদ্ধে ৬৭ কোটি ৪৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৪২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ৫৯ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ১৩২ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে রাজধানীর লালবাগ থানায় ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর মামলা করে তখনকার দুর্নীতি দমন ব্যুরো (বর্তমানে দুদক)।

বিচার কার্যক্রম শেষে ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত হাজি সেলিমকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ১০ বছর এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে তিন বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয়।

এ  রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ২৫ অক্টোবর হাইকোর্টে আপিল করেন হাজী সেলিম। ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি হাইকোর্ট তার রায়ে হাজি সেলিমের সাজা বাতিল করে তাকে খালাস দেয়।

এরপর হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে দুদক। আপিলের শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি আপিল বিভাগ হাজী সেলিমকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের ওই রায় বাতিল করে আপিলের পুনশুনানি করতে হাইকোর্টকে নির্দেশ দেয়।